Sunday, 10 April 2022

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল 
রূপো বর্মন 

একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যাচ্ছে। দুজনের গায়ে নীল আর সাদা রঙের জামা পায়ে সাদা মজা এবং কালো বুট জুতো। পিঠে ঝোলানো সাদা রঙের ব্যাগ দুটি যেন শান্তির ঝোলা। চোখ ফেরানো যায় না নিষ্পাপ মনের নিষ্পাপ হাসি দেখে।



হঠাৎ একটা কথা শুনতে পেলাম "ইস, লোকটাকে মেরে ফেলল বুঝি"। কথাটি অবশ্য আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাস গাড়ির জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তি বলেছিলেন। কথাটি শোনামাত্র আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। তারপর দেখতে পেলাম সাত আট জনের মতো মানুষ একটি চলন্ত গাড়ির পেছন পেছন ছুটছে। গাড়িটিতে ওঠার জন্য। তাদের গায়ে ধাক্কা লেগে একজন মানুষ মাটিতে পড়ে গেছে আর সবাই ওই মানুষটির উপর ভর দিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম  মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটি নিজের জামা কাপড় ঝেড়ে উঠছে আর থলে থেকে পড়ে যাওয়া জিনিস গুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে থলেতে ঢোকাচ্ছে। তার মধ্যে কিছু কিছু জিনিস আমার চোখে পড়ল সেগুলো ছিলো প্লাস্টিকের বোতল, ছেড়া খবরের কাগজ, নষ্ট হয়ে যাওয়া আপেল, পঁচা কলা, ভাঙ্গা বিস্কুট আর পাউরুটির কয়েকটা টুকরো। আমি তো অবাক হয়ে গেছিলাম লোকটিকে এসব ব্যাগে ঢোকাতে দেখে। তারপরেই খেয়াল করলাম লোকটির জামা কাপড় গুলো খুব নোংরা এবং ছেড়া। রোগা পাতলা চেহারায় একমুখ দাড়ি, মাথায় বড়ো বড়ো চুল। কয়েকজন লোক বলে উঠল "পাগল বলে মানুষ আজকাল মানুষকে মানুষ বলে মনে করে  না, কি দিন এলো"। কথাটি শোনামাত্র আমার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে গেল যে, এতক্ষণ ধরে যাকে আমি দেখছি সে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ যাকে আমরা সহজ ভাষায় পাগল বলে থাকি।




পাগলটির ওই জিনিস গুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে থলেতে ঢোকানোর সময় স্কুলের পথে রওনা দেওয়া বাচ্চা দুটি সেখানে এসে হাজির হলো। পাগলটির থলের সব অপরিস্কার জিনিস বের করে দিল এবং তাদের দুজনের স্কুলের টিফিনের খাবার গুলো পাগলটিকে দিয়ে দিল। আর অনেকের জুতোর আঘাতে পাগলটির বাম হাতে একটু চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। তখন তারা তাদের রুমাল দুটি দিয়ে পাগলটির হাত বেঁধে দিল। তারপর দুজনে পাগলটির হাত ধরে আমার থেকে হাত দু-এক দূরে এনে বসাল। অবশ্য আমি একটি বিশ্রামাগারে দাঁড়িয়ে ছিলাম গাড়িতে ওঠার জন্য। তারপর তারা পাগলটিকে বলল "কাকু রাস্তা পার হওয়ার সময় ডান দিক বাম দিক দেখে পার হবেন। নোংরা খাবার খাবেন না, চুল দাড়ি নখ কাটবেন এবং প্রতিদিন স্নান করবেন, আর সবসময় জামা কাপড় পরিস্কার রাখবেন"। এই কথা গুলো বলে দুজনে পাগলটির পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল "কাকু আজ আমাদের পরীক্ষা আছে আমাদের আশীর্বাদ করুন যাতে আমরা ভালো করে পড়াশোনা করতে পারি আর মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি"। বাচ্চা দুটির কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রাস্তায় একটি রিকশাওলা বাচ্চা দুটি কে ডাকল এবং বাচ্চা দুটিও রিকশায় উঠে পড়ল। যখন রিকশাটি স্কুলের পথে রওনা দিল। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগলাম, এটাই হয়তো পরিবার শিক্ষা আর স্কুল শিক্ষার ফল।

Saturday, 9 April 2022

অকৃত্রিম অভিলাষকলমে- তাপসী ব্যানার্জী

অকৃত্রিম অভিলাষ
কলমে- তাপসী ব্যানার্জী

ছক্কা .....  আ.... 
আরে, এ তো ধীমান দার গলা মনে হচ্ছে ।
শ্রীমতী ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলে ফেলল কথাটা রুমা কে
অবশেষে রুমাদের বাড়ি পৌঁছালো তারা।
রুমা টি.ভি. টা একটু চালাবি।
রাস্তায় আসার সময়ে একটি দোকানের টি.ভি. তে  আই.পি.এল  কমেন্ট্রিতে যার গলা পেলাম আমার ভীষণ পরিচিত মনে হল।
টি.ভি.  টাতে পিকচার আসা মাত্র লাফিয়ে উঠল শ্রীমতী
ধীমান দাই তো!!!...
রুমা কৌতুহলবিষ্ট হয়ে জিজ্ঞাসা করল, বিশেষ পরিচিত??
হ্যাঁ রে, আমি যখন স্কুল,  ধীমানদা তখন কলেজে কিন্তু আমাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া একই ছিল। 
কোনদিন ভাবিনি ওই পাড়া থেকে চলে এসে অন্য কোথাও থাকতে হবে 
হারিয়ে ফেলে ছিলাম আমার সমস্ত স্বপ্ন। 
আজ ও কে এত দিন পরে টি.ভি. তে দেখার পর নতুন করে স্বপ্ন জেগে উঠল মনে,  ইচ্ছা করছে পুরোনো পাড়ায় গিয়ে একবার দেখা করি ওর সঙ্গে।।

Thursday, 7 April 2022

ঘর--সন্ধ্যা রায়

ঘর--

সন্ধ্যা রায়

অচিন্ত্য দত্তের বাড়ি খিদিরপুর । অচিনত দত্তর মেয়ের নাম ববিতা, তার ডাকনাম বুবু। ছেলের নাম রণন, তাকে রাণি বলে সবাই ডাকে l স্ত্রীর নাম তৃষা। দত্তবাবু অনেক রাতে পার্টি করে

রাতে বাড়ি ফিরে এলে উনার স্ত্রীর সঙ্গে আর কোন কথা হয় না। তাই  সকাল বেলা স্ত্রী শুধালো, কালকে রাতে কোন পার্টি ছিল এত রাত্রে বাড়ি ফিরলে?কৈ আমায় বলনি তো?

দত্ত বাবু একটু রাগ চটা মানুষ বটে। এমনিতে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঝগড়া লেগেই থাকে। আর দুচার কথার পরেই তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠেন।

সকালে স্ত্রীর কথা শুনেই দত্তবাবুর মাথায় আগুন লেগে গেল, তিনি চিৎকার করলেন, বেরিয়ে যাও বেরিয়ে যাও ঘর থেকে,  তোমার থেকে অনুমতি নিতে হবে আমার? মোটা একটা বসতার  মতন দেখতে, কোন পোশাকে তোমাকে মানায় না, অসহ্য লাগে। আমার সাথে তোমাকে নিয়ে যেতে হবে ? সহ্য করতে পারিনা তোমাকে, বেরিয়ে যাও। তোমাকে নিয়ে পার্টিতে যেতে পারবো না। 

শুনে মেয়ে বলল, মানিয়ে নিতে পারো না বাবার সাথে তখন কেন সকালবেলা লেগেছ মা ! 

ছেলে বললো, বাবা মনে করে তুমি একটা আনকালচারড,  তারপরও তুমি কেন মেনে নিতে পারো না। তুমি কেন বুঝতে চাও না মা? 

দত্ত বাবু ছেলে মেয়েকে নিজের মত করে ভালো শিখিয়ে রেখেছ। 

তৃষ্ণা সকলের সুখ স্বাচ্ছন্দ দেখতে দেখতে কবে  নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে নিজেও জানে না। তৃষাকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল অচিন্ত্য। তৃষ্ণা এম এ  ইন ইংলিশ ছিল। তৃষা  একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরিও করতো। সে আজ সহ্য করতে পারলো না, ছেলে মেয়ের কথাগুলি, স্বামীর এই বঞ্চনা । সে ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে ঠিক করে নিল। সাথে সাথে তৈরি হয়ে সে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল । কারো সাথে কোনো কথা বলল না, কেউ তাকে জিজ্ঞাসাও করল না।

ও নিজেকে বলল, আস্তানা ঠিক পেয়ে যাব, আমি যাচ্ছি। এই বলে বেরিয়ে গেল তৃষ্ণা। 

একটু পরেই ববিতা বলল, আমার ড্রেস প্রেস করা নেই । টিফিন বক্স তৈরি নেই, আমি কি করে স্কুলে যাব, বাবা? 

অচিন্ত্য বাবু বললো, কাজের মেয়েটা ব্রেকফাস্ট করে দেবে, তৈরি হয়ে যাবে, স্কুলে চলে যাবে-- এরপর তিনি নিজে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলেন অফিসের উদ্দেশ্যে। কাজের মেয়েটা এলে চিন্তায় পরল। এমনটা কোনদিন হয় না ম্যাডামই তো সব বানিয়ে দেয়। সে যা পারল করে দিলো, তারপরে রণন আর ববিতা বেরিয়ে গেল স্কুলে। 

বিকেলে অচিন্ত্য ঘরে এসে দেখে দোরগোড়ায় কতগুলি জুতো কাল থেকে পড়ে আছে। কেউ সরায়নি, ব্যালকনিতে অনেক জামাকাপড় কাচা আগোছালো এখানে ওখানে পড়ে আছে। কেউ তোলার নেই।  রনি আর বুবু স্কুল থেকে ফিরেছে। অচিন্ত্য বলল, বুবু তুমি এসব জামা কাপড় গুলো গুছিয়ে ফেল-- 

বুবু পরিষ্কার বলল, ওসব মার কাজ, মা করবে , আমি করি না। 

অচিন্ত্য বাবু এবার রনিকে বলল, রনি তুমি জুতোগুলো গুছিয়ে তুলে রাখ তো সেলফে। 

রনিও বলল, আমি পারবো না বাবা, এটা মায়ের কাজ, মাই করে, মাকে বলো। মাকে তুমি   তাড়িয়েছে বাবা, এখন কাজ তো তোমাকেই করতে হবে। এখন রাতের খাবার কে বানাবে বল ? সেটাও তোমাকেই করতে হবে। তুমি মাকে কেন তাড়ালে বাবা ?

অচিন্ত্য বলল, আজ রাতে আমাদের হোটেলের খাবার খেতে হবে। সে সকালে উঠেই চিন্তায়  পড়ল । কাজ মানে  এতো কাজের সমুদ্র। ঠিক করলো আজ আর অফিসে যাবে না। ভাবলো তৃষা কত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে । সময় মতন খাওয়া-দাওয়া, সবকিছু সময় মত, যেন একটা অফিসারের  ঘর। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শান্তির নীড়। আমি শুধুই গঞ্জনা বঞ্চনা করি ওকে, বুঝতেই চাই না।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই কেন যে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম। সোজা সাপটা জবাবটা দিলেই ত মিটে যেত। এত মাইনে পাই একটা ভালো কাজের লোক রাখলেও নিজের খেয়াল রাখতে পারত। ভুলটা আমার। নাঃ ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। এটা আমার উচিত হয়নি।

 

অচিন্ত্য আজ অফিস যাইনি বলে ওর অফিস কলিগ কাজল আর ওর হাসবেন্ড বেড়াতে আসলো। এসেই প্রথম প্রশ্ন কিরে, আজ অফিস যাসনি কেন? 

অচিন্ত্য বলল, তৃষ্ণার মার শরীর খারাপ তাই ও ও বাড়ি গেছে । আমি ছেলে মেয়ে সামলাচ্ছি আর অফিস যাওয়া হল না। কাজল বলে উঠল, দিদিভাই নেই, তবে আজকে আর বিরিয়ানি খাওয়া হলো না। ওরা কিছুক্ষণ বসে ঘরে ফিরে গেল। 

সকাল হতেই অচিন্ত্য বন্ধু, রঞ্জনের ফোন এলো। রঞ্জন বলল, কিরে আজ সকালবেলা মন্দিরে গিয়েছিলাম । দেখলাম, ওখানে বৌদি লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগ খাচ্ছে। কি হল বল তো এতদিন এরকম তো কোনদিন দেখিনি? 

অচিন্ত্য বলল, আমি ফোন রাখছি পরে তোকে সব বলবো।

এই বলেই সে ফোন রেখে দিল। আর তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে কার নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি পৌঁছাল কালীমন্দিরে, দেখল তৃষা ওখানে ভোগ খাচ্ছে, কালীমন্দিরের চত্বরে বসে। অচিন্ত্য তৃষার কাছে গিয়ে ওর হাতটা ধরে সোজা চলে এসে কারের মধ্যে বসিয়ে দিল তৃষাকে। বিনা বাক্য ব্যয়ে অচিন্ত্য ঘরে পৌঁছে গেল। তৃষাকে জড়িয়ে ধরে বলল-আমার ভুলের সাজা আমার বাচ্চাদের দিও না । আমি ভুল করেছি, এ ভুল আর কখনো হবে না তৃষা। বাচ্চারা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বাচ্চাদের কাঁদতে দেখে তৃষ্ণা বলল, এ ঘর আমার এ ঘর ছেড়ে আমি কখনো যেতে চাইনি। আমি আর কখনো তোমাদের ছেড়ে যাবো না।

যে যেখানে দাঁড়িয়ে --তাপসকিরণ রায়

যে যেখানে দাঁড়িয়ে --
তাপসকিরণ রায়

রমাকান্ত দেখেছেন মানুষের আর্থিক অবস্থা মানুষকে একটা স্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেমনটা তোমার সমর্থ তেমন ছাঁচে তোমায় চলতে হয়। তোমার চারপাশটাও তেমনি ভাবে গড়ে ওঠে। 
রমাকান্তদের আর্থিক অবস্থা একদিন তেমন একটা ভাল ছিল না।  
সেদিন রমাকান্ত রেশনের দীর্ঘ লাইনের শেষ দিকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সময় গুনে যাচ্ছিলেন। মেয়ে-বৌদের তখন আলাদা লাইন। এক সময় মিষ্টি এক কণ্ঠ রমাকান্তর কানে এসে পৌঁছল, রমা দা, তুমিও আমাদের মত লাইনে দাঁড়িয়ে ? 
চোখ তুলে তাকিয়ে ছিলেন রমাকান্ত, অনন্যা লাইনে দাঁড়িয়ে।   
অনন্যা আবার বলে উঠেছিল, তুমি কেন ? রুমা কৈ ?
রমাকান্তর বোন রুমাই বরাবর রেশনের লাইনে দাঁড়ায়। অনন্যা ওর সঙ্গে এক স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। সেই সূত্রে অনন্যার ওদের ঘরে যাতায়াত ছিল। রমাকান্ত ছোট বেলায় যে একেবারে লাইনে দাঁড়াননি তা নয়। কিন্তু কিছুটা বড় হওয়ার পর আর তিনি লাইনে দাঁড়াবার মানসিকতা খুঁজে পেতেন না। মার বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি রেশন নিতে যেতেন না। এ জন্যে বাবার কাছ থেকে তাঁকে কড়া কথা শুনতে হত, লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা করে ? আমাদের মত গরীবদের এমনি লজ্জা করলে চলে ? বাবা আরও একটু রেগে গেলে বলতেন, তুমি কোথাকার লাটের বাট হয়ে গেছ ?
কথা সত্যি। উঠতি বয়সের রমাকান্ত তখন কিছুটা উড়ু উড়ু মন নিয়ে ঘুরে বেড়ান। ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট ছাড়া তাঁর পরতে ইচ্ছে হয় না--সেদিন অনন্যাকে তিনি বলে ছিলেন, রুমার শরীর খারাপ। 
--ও, ছোট জবাব ছিল অনন্যার।
রেশনের দুটো লাইন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। এক সময় পেছনে দাঁড়ানো অনন্যা রমাকান্তর কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ছিল। এগোতে এগোতে রমাকান্তর হাত, কাঁধ এসে ঠেকছিল অনন্যার শরীরে। অনন্যা স্বাভাবিক, কিন্তু রমাকান্তর কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। এ অনন্যার দিকে তিনি কখনো আগে ভাল ভাবে তাকিয়ে দেখেননি। মনে হল যেন এই প্রথম তাঁর চোখ পড়ল। শ্যামলা রঙের মাঝে শ্রীময়ী আঁকের এক চেহারা, খুব সহজ সরল লাবণ্যময় এক চেহারা বলে মনে হল। ভিড়ের ঠাসাঠাসি অবস্থায় ওর মুখমণ্ডলে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। মাথার এলোমেলো কেশ বিন্যাসের ফাঁকে ফাঁকে তার চারপাশের ছোট ছোট চুলগুলি শৈল্পিক ধাঁচে ফিনফিন উড়ছিল। অনন্যার চোখ রমাকান্তের চোখে এসে পড়ল। রমাকান্ত তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে নিলেন। 
--রমা দা, আপনি একটু ঘুরে আসুন না বাইরে থেকে ? খুব ঘামছেন আপনি। 
তাকালেন রমাকান্ত অনন্যার দিকে। শান্ত এক মুখচ্ছবি, কথায় তার সহানুভূতির সুর। কিন্তু তার বেশী কিছু নয়, চেহারা স্বাভাবিক, মুখের হাসি সীমিত, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে না। এমনি একটা মেয়ে যে আছে তাঁদের গরীব ঘরের সীমান্তে তিনি যেন ভাবতেই পারেননি। কৈ আগে তো রমাকান্তর চোখে কোন দিন এমনি ভাবে পড়ে নি ! অথচ এক পাড়ায় বাস তাদের। হ্যাঁ, তাদের মত গরীব জরাজীর্ণ ধাঁচের ঘরের দিকে, সে সঙ্গে রিক্ত অর্থহীনতায় ভোগা পরিবারের দিকে কোন দিন তেমন ভাবে রমাকান্তর নজর পড়েনি হবে। 
--রমা দা, আমি আপনার লাইনটা দেখব, আপনি যান না, বাইরের হাওয়ায় একটু ঘুরে আসুন, মেয়েটি আবার বলে উঠলো। অনন্যার শান্ত মুখে রমাকান্ত আবার সহানুভূতির ছাপ দেখতে পেলেন। ভাল লাগছিল তাঁর, এমনি একটা মেয়েকে আলাদা ভাবে কে না পছন্দ করতে চাইবে ? ওদের পরিবারের দৈন্য অবস্থার মধ্যে মেয়েটিকে যেন মানায় না। ওদের ঘর,  জীবনযাত্রার মাঝে কেমন করে এই মেয়েটি হারিয়ে যেতে পারে ?
--না--ঠিক আছি আমি, রমাকান্ত সেদিন বলেছিলেন। আসলে ভালো লাগছিল—বীতশ্রদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়েও তাঁর যেন সেদিন খুব ভালো লাগছিল। এই একটি ঘণ্টায় তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছিল ! অনন্যার মনের সঙ্গ পাবার জন্যে তাঁর মন যেন লালায়িত হয়ে উঠছিল। তিনি বলেছিলেন না, আমার কিছু অসুবিধা হচ্ছে না। 
রেশন তোলার সময় ব্যাগ ধরে সাহায্য করেছিল অনন্যা। ও সেদিন অন্য এক একক চেহারা নিয়ে রমাকান্তর সামনে ধরা দিয়েছিল।
তারপর দেখা হত অনন্যার সঙ্গে, কথা হত। অনন্যা স্বাভাবিক আর রমাকান্ত ছিল কিছুটা উচ্ছল। এমনি করে ওরা ধীরে ধীরে একে অন্যের কাছে এগিয়ে এসেছিল। এবং একটা সময় এসেছিল যখন উভয়ের সান্নিধ্য-ভালবাসা প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল। 
সময় তার ধর্মে এগিয়ে চলছিল। ইতিমধ্যে রমাকান্ত পাস করে চাকরি পেয়ে দূর দেশে বেরিয়ে গেল। চাকরির পাঁচটা বছরও কেটে গেল। তিনি বাবা মাকে নতুন ফ্যাটে নিয়ে তুললেন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় মাইনেতে রমাকান্ত তখন ধনবান। দৈন্য অবস্থার লক্ষণগুলি তাঁদের চেহারা পোশাক থেকে ক্রমশ: সরে গিয়েছিল।
অনন্যার সঙ্গে গোনা কয়েক বার দেখা হয়েছে রমাকান্তর। কিন্তু আগের সেই চোখ যেন তিনি হারিয়ে ফেলে ছিলেন। অনন্যা তাঁর চোখে অনেকটা মলিন মনে হয়েছিল। দুঃখ দারিদ্র্যতার জরাজীর্ণ ছাপ যেন অনন্যাকে ঘিরে ধরছিল।  
সত্যি কি তাই--সত্যি কি অনন্যা তার  রূপ গুণ সৌন্দর্য স্বভাব হারিয়ে ফেল ছিল ? রমাকান্ত বুঝতে পারছিলেন না। অনন্যাও চেহারা ছবিতে তার প্রেমিক রমাকান্তকে চিনে উঠতে পার ছিল না। 
--তোমরা তো চলে যাচ্ছ, আমার কি হবে রমা দা ? অনেক কষ্টে অনন্যা বলতে পেরেছিল কথাগুলি। 
--তুমি তো আমার থাকবেই অনন্যা, আমি আসব, তোমায় দেখে যাব, রমাকান্তর তাঁর আওয়াজে তখনও বুঝি সেই আপনত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেননি! 
একদিন সময় আড়াল করে নিলো সব। রমাকান্ত অনন্যাকে ভুলতে বসলো।  অনন্যা এক সাধারণ মেয়ে, বস্তির সমতুল্য এক বাসিন্দা বই তো নয় ! তার বেশবাস বড় নগণ্য, অনুজ্জ্বল বলে মনে হত রমাকান্তর। এখনকার রমাকান্ত যে বড় বর্ণময়--চাকচিক্যের মাঝে চকমকি পাথরের মত উজ্জ্বল !   তাঁর কি করে মনে হবে অনন্যা তাঁর জীবন সঙ্গিনী হতে পারে ? ওর বুভুক্ষু পরিবারকে তিনি কি নিজের সঙ্গে  মানিয়ে নিতে পারবেন ? না, তা আর সম্ভব নয়--শত বর্ণাঢ্যের মাঝে  প্রসাধনী রঙচঙ মোহ  তখন তাঁর যে  পছন্দ ! সভ্যতার রঙরাংতার মোড়া দেহই যেন তাঁর একান্ত কাম্য। ধনীর মেয়েদের মাঝে তিনি কিছুতেই অনন্যাকে মানিয়ে নিতে পারেন  না। আর তাই বুঝি একদিন তিনি সব কিছু ভুলে গিয়ে এক ধনবান বাবার আধুনিকা মেয়েকে স্ত্রী বলে গ্রহণ করেছিলেন। 
বিয়ের পরের দশটা বছরও কেটে গেল। রমাকান্ত তখন তাপনিয়ন্ত্রিত ঘর, গাড়ী ছাড়া চলতে পারেন না। একটুতেই তিনি হাঁপিয়ে যান, তাঁর ফর্সা মুখে লাল ছোপ পড়ে যায়। আজকাল অনন্যা তাঁর স্মৃতিতে মাঝে মধ্যে এসে উদয় হয়। নিজের স্ত্রীর দায়বদ্ধতা বড় বেশী হয়ে তাঁর চোখে ধরা পড়ে। স্ত্রীর ব্যবহার কাঠিন্য সময়ে অসময়ে তাঁকে বেশ পীড়া দিয়ে যায়। এসবের মাঝে তাঁর হঠাৎ হঠাৎ অনন্যার কথা মনে পড়ে যায়। একবার মনে হত তিনি যদি অনন্যাকে বিয়ে করতেন তা হলে বোধহয় এমনটা হত না। কিন্তু না--ওই অর্থহীন দীনতা, ওই পরিশ্রমের ঘাম চিপচিপ অবস্থা তিনি কি বরদাস্ত করতে পারতেন ? রমাকান্ত দেখেছেন, সংসারের জব্বর দায়- গ্রস্ততা, অর্থের স্বচ্ছন্দ সীমার মাঝেও শান্তির দীনতা, মনের অমিল বোঝার টানাপোড়েন। সব মিলিয়ে মনের মাঝে কোথাও যেন শূন্যস্থান থেকেই যায় ! কামিনী কাঞ্চন দপ জ্বলে উঠে তার আলো হারিয়ে ফেলে। এক অদ্ভুত সুখ দুঃখের দহনে পুড়ে যেতে থাকে মনের গভীরতা। তাই বুঝি এক মেঘলা দিনে রমাকান্ত একলাটি বেড়িয়ে পড়েছিলেন কোন অজানায় পাড়ি দিতে ! 
সেদিন রমাকান্ত নিজের অজান্তেই কি এসে পড়েছিলেন তাঁদের সেই গরীব হতশ্রী গ্রামে ? তিনি সামনে দেখতে পেলেন তাঁদের জরাজীর্ণ সেই পুরানো ঘরটাকে। আগের মতই সেটা পড়ে আছে বৃদ্ধ ন্যুব্জ ভাব নিয়ে।  ধীরে ধীরে ড্রাইভ করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ একটা মুখ তাঁর নজরে পড়ে গেল। চেনা একটা মুখ। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! 
অনন্যা না ! চমকে উঠলেন রমাকান্ত। থেমে গেলেন তিনি। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে বাইরে এসে নেমে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, অনন্যা,  আরও কালো হয়ে গিয়েছে, সেই উজ্জ্বলতা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে। শরীরে তার ময়লা শাড়ি জড়ানো, ঝুলঝুলে অমাপের একটা ব্লাউজ তার বুকে জড়ানো। তার চোখের কোলে কালো ছোপ। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন রমাকান্ত, সে অনন্যা হিয়ে গেছে--অর্থহীনতায়, বুভুক্ষায়, দুঃখ কাতরতায়। আর এইসব লক্ষণগুলোই তো মানুষকে বোধবুদ্ধিহীন নিম্ন মাত্রায় টেনে নেয়।   
এক গ্লাস জল নিয়ে অনন্যা কখন যেন রমাকান্তর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে,  আপনাকে খুব পরিশ্রান্ত লাগছে, রমা দা ! আপনার জন্যে জল এনেছি, হাত বড়িয়ে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল অনন্যা। 
সত্যি এ মুহূর্তে ভীষণ তৃষ্ণার্ত রমাকান্ত, এত কিছুর পরেও অনন্যা তা বুঝতে পেরেছে ? জলের গ্লাস তিনি হাতে তুলে নিলেন। অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন আছো, অনন্যা ?
অনন্যা কিছু বলল না, তার মুখে এক চিলটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। 
না, কোথাও নেই, সেই অনন্যার লক্ষণ আজের অনন্যার মধ্যে কোথাও খুঁজে পেলেন না রমাকান্ত। জলটা হাতে ধরে আছেন তিনি। 
--খুব পরিশ্রান্ত লাগছে আপনাকে, গরমে আপনার মুখটা কেমন লাল পড়ে গেছে ! অনন্যার কুণ্ঠিত গলা শুনতে পেলেন রমাকান্ত।  
এক রাশ ব্যর্থতা জমা পড়ে আছে রমাকান্তর মনে। তিনি জলের গ্লাস মুখের কাছে তুলেও নামিয়ে নিলেন। না, গ্লাসের চেহারা ভালো লাগছে না--আর তা ছাড়া জলের রঙও কেমন যেন ঘোলাটে ! পিউরিফাই জল ছাড়া তিনি তো কিছুই মুখে দিতে পারেন না—রমাকান্ত যেন আপন মনেই বলে উঠলেন, না, একদম জল তেষ্টা নেই দেখছি--
রমাকান্ত ভরা জলের গ্লাসটা ফেরত দিতে হাত বাড়ালেন। অনন্যা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। নীরবে জল ভরা গ্লাসটা সে নিজের হাতে ফিরিয়ে নিলো। 
                                                সমাপ্ত 

Wednesday, 6 April 2022

আমার কথা-- ঊশ্রী মন্ডল

আমার কথা
ঊশ্রী মন্ডল


                              আমার ছোটবেলাটা কেটে গিয়েছিলো দুর্গাপুরের অলিতে গলিতে,ডেয়ারি কলোনির ফ্লাটে থাকতাম,সেই সময়টা খুব সুন্দর ছিলো l হাসি গল্পে খেলাধুলা পড়াশুনার মধ্যেই কাটছিলো অথচ ভরপুর দারিদ্র ছিলো, বাবা পরলোক গমন করার পর আমরা সকলেই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম, অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে মা আমাদের মানুষ করে তুলেছিলেন l যখন যৌবনে উত্তীর্ণ হলাম মা বিয়ে দিয়ে দিলেন , এসেছিলাম বধূ হয়ে পানাগড়ে l  
             অনুন্নত জায়গা, শিক্ষার জন্য ভালো স্কুল কিংবা চিকিৎসার জন্য হসপিটাল ছিলো না, সবেধন নীলমনি একটা হেলথ সেন্টার ছিলো, তাতেই যা চিকিৎসা হবার হতো নয়তো দুর্গাপুরেই যেতে হতো,স্কুল কলেজেও পড়ার জন্য ঐ দুর্গাপুরেই যেতে হতো, কর্মেরও কোনো সুযোগ ছিলো না l 
       যাই হোক,স্বামীর কর্মস্থল ছিলো দিল্লিতে,তাই নয় মাসের সন্তানকে কোলে করে দিল্লিতে চলে গিয়েছিলাম l ওখানে দীর্ঘ সতেরো বছর পর পরিজনদের আগ্রহে ফিরে এলাম পানাগড়ে , বাড়ি বানালাম, সামনে একটু জমি পড়ে ছিলো তাতে সবজি ফলাতাম, পাড়ার প্রতিবেশীদের দিতাম নিজেও খেতাম মনের আনন্দে l
                 কাঁকশা থানার ঠিক পিছনে কুলু পুকুর নামে একটা পুকুর আছে, তার ঠিক পাশেই আমার ঘর l পুকুরের চারিধারে অনেকটা জায়গা বড়ো বড়ো গাছে ঘেরা,একমানুষ সমান ঝোপঝাড়ে ভর্তি l পুকুরের জল বড়োই নোংরা, ওখানেই সকলে বাসন মাজে, কাপড় কাচে, আবার এদিক ওদিক চোরা নজর হেনে মূত্রও ত্যাগ করে, অবাক কান্ড ঐ জলেই স্নান করে মুখ ধোয়, মাগো কি ঘেন্না l আমি অবশ্য কোনোদিন ঐ পুকুরে যাইনি, কেননা ঘরেই আমার সব বন্দোবস্ত ছিলো l
             পঞ্চায়েত থেকে ঘরে ঘরে মলমূত্র ত্যাগের জন্য ঘর বানিয়ে দিয়েছিলো l তবুও কেন জানি না, ঐ স্থানে না গিয়ে পুকুরের পাশে ঝোপঝাড়ে পায়খানা করতে আসতো সারা পাড়া জুড়ে l কি গন্ধ, তেমনি মশা মাছি -দিনেদিনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে লাগলাম l মাঝে মাঝে তক্কাতক্কি লেগে যেতো l আজব চিন্তাধারা ছিলো ওদের, বন্ধ ঘরে নাকি বাহ্য হয়না, তাছাড়া ট্যাংকি ভরে গেলে কে পরিষ্কার করবে ?  
      সেদিন পাশের বাড়ির দিদিটা স্বামীর অত্যাচারে গায়ে আগুন লাগিয়ে মরে গেলো l স্বামী ছিলো  পাঁড়মাতাল, রোজগারপাতি কিছুই করতো না, পেটে দেবার নয়,পিঠে দেবার গোসাঁই ছিলো l তবে,হ্যাঁ একটা গুন ছিলো, ভালো চুরি করতে পারতো, দিনের বেলায় ছিলো ভদ্রবেশী ভালো লোক, রাত্রি হলেই বেরিয়ে পড়তো নিজকর্মে l ভরপেট মদ খেয়ে বৌটারে মুখবেঁধে পিটাতো, রাগে দুঃখে মরে যেন শান্তি পেলো,ওদের বাড়ির দিকে তাকালে গাটা ছমছম করতো l আশ্চর্য কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই ঐ বদমাশ আবার বিয়ে করে বসলো, সত্যি বাংলাদেশে পাত্রের আকাল পড়েছে, তাই ঠিকমতো খোঁজখবর না নিয়েই মেয়েদের পাত্রস্থ করছে l সৎমা কি পরের বাচ্চাকে ভালো বাসতে পারে, তাই কচি কচি বাচ্চাগুলো খেতে পেতো না,বেশিভাগ দিনই শুকনো মুখে খাবারের আশায় বাড়িতে বাড়িতে ঘুরতো,দেখে বড়ো মায়া লাগতো,মাঝে মাঝে সাহায্য করতাম l আমরাও দিন আনি দিন খাইয়ের দলেরই লোক, তাই বিশেষ একটা সাহায্য করতে পারতাম না l একসময় ওরা দক্ষচোর হয়ে গেলো এবং ধনীও হয়ে উঠলো l যাক গে, ওদের কথা ভেবে আমার কি লাভ ,তাই নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগলাম, সে কলেজে পড়ে পল.সাইন্স এ অনার্স নিয়ে রানীগঞ্জে, আসতে আসতে রাত্রি হয়ে যায়, যতক্ষণ না ঘরে ঢোকে ততক্ষন বেশ চিন্তায় থাকি l
           কার্যোপলক্ষে আমার স্বামী আবার চলে গিয়েছেন গোয়ায় l সেদিন স্বামী বলছিলেন উনি নাকি লিফটে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন, দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, কি করে বেরোতে পারবে ভেবেই পাচ্ছিলো না l নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে ফোনও করতে পারছিলো না l ভাগ্যিস ওখানকার লোকেদের হঠাৎ মনে পড়ে রবীন মন্ডল নিখোঁজ ,তাই খোঁজ করতে থাকার পর বন্ধ লিফটের হদিস পায়, তারপর অনেক  কষ্টে গেট কেটে বের করে আনে, একথা শুনে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম l
       
           আমি তখন চাকরি করতাম একটা পেট্রল পাম্পে, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে l সেদিন দিদি বললো, মায়ের শরীরটা ভালো নেই, তোকে দেখতে চাইছে, একবার ঘুরে যাস l বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমার আজকে ঘরে ঢুকতে একটু দেরী হয়ে যাবে, চিন্তা যেন না করে, দরকার পড়লে দিদির বাসাতেই থেকে যাবো, একটু সামলে নিয়ো l
         মায়ের কাছে গিয়ে দেখি,মা শুয়ে আছে ক্লান্ত শ্রান্ত রোগজীর্ণ মুখ, কিন্তু ভালো আছেন আগের তুলনায়, কিছুক্ষন বসে গল্প করলাম l এবার ছেলে ও স্বামীর জন্য মন খারাপ করতে লাগলো l ভাবছি, কাল সকালে ছেলে কলেজে যাবে, ওনারও ডিউটি সকালেই, সব সামলে নিতে পারবে তো ? বেরিয়ে পরি, এখন বেরিয়ে পড়লে পানাগড় যাবার লাস্ট বাসটা পেয়ে যাবো, যেই না ভাবা অমনি উঠে পড়লাম , মা বললেন, থাক না আজকে এইখানে কালকে এখান থেকেই ডিউটিতে চলে যাস l আমি নানান অজুহাত দেখিয়ে মাকে মানিয়ে হন্টন দিলাম মুচিপাড়ার উদ্দেশ্যে l এসে শুনি লাস্ট বাস চলে গেছে,মায়ের কাছে ফিরে যাবো নাকি, ভাবতে ভাবতে দেখি স্টেশনে যাবার একটা বাস আসছে l ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারলে  ব্ল্যাক ডায়মন্ডটা পেয়ে যাবো, বাসে উঠে পড়লাম l স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে শুনি ট্রেন লেটে চলছে, অগত্যা অপেক্ষা করতে লাগলাম, অবশেষে ট্রেন এলো, চড়ে বসলাম এবং পানাগড়ে এসে নামলাম l গ্রামাঞ্চল তো একটু রাত হলেই নিঝুম হয়ে যায় l 
       হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে আমাদের পাড়ায় এসে পৌছালাম, একটু শর্টকাট নিলাম, কুলু পুকুরের পাশ দিয়ে যে সরু রাস্তাটা গিয়েছে তা ধরলাম l একটু এগিয়ে দেখি এক মহিলা পুকুর থেকে উঠে আসছে, বলে, কে যাও গো..গুড্ডুর মা নাকি ? আমি বললাম,' হ্যা ' , সেও আমার সাথে হাঁটতে লাগলো, সে নানান কথা বলতে লাগলো, বলল, ' তালের বড়া করবে তো? আমি আজকেই হাট থেকে তাল কিনেছি, তুমি কেননি ? 'আমি বললাম, 'সারাদিনের পরে এই ঘরে ঢুকছি, কোথায় তাল পাবো পরের হাটে কিনে নেবো |' হটাৎ খেয়াল করি , ফকিরের মা যেন লম্বায় আমার থেকে একটু বেশী বেড়ে গেছে , অথচ ওতো অনেক ছোটোখাটো মানুষ ! ভাবতে ভাবতে চলছি, আবার পাশে তাকিয়ে দেখি ওমা ও যে একটু একটু করে লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তাল গাছতার পাশে যেই দাঁড়ালাম অমনি সে হাত বাড়িয়ে দুটো তাল পেড়ে আমায় দিলো, আমার তো ভয়ে হাত পা ঠক ঠক করে কাঁপছে, বলে উঠলাম, ' হে রাম, তুমি এটা কি করে করলে  ? ' যেই না বললাম, অমনি সে বলে উঠলো,   ' দূর ছাই, এই শত্তুরটার নাম নিতে কে বললো ? জানো না,হাট থেকে ফিরেই আমি হার্টফেল করে মরে গেছি, তারপরই তো ভূত হয়ে গেছি l ভাবছিলাম এবার তোমার ঘাড় মটকাবো, তা হতে দিলে না, এখন এবারের মতো গেলাম,পরের বার যদি মওকা পাই অবশ্যই ঘাড় ভাঙবো তোমার l' আমি ভয়ের চোটে ও বাবা, ও মা বাঁচাও গো বলে চিৎকার করে ছুট লাগালাম, একবার হোঁচট খেয়ে পড়ি,আবার উঠে ছুট লাগাই, পিছন থেকে শুনতে পাচ্ছি হি হি হি হি হাসির শব্দ l কোনোরকমে প্রাণ হাতে নিয়ে ঘরে এলাম,সেদিন থেকে আর ঐ পুকুরের রাস্তায় যাইনি l
                পেট্রল পাম্পের মালিকানা বদল হওয়াতে আমার চাকরি গেলো, অনেক চেষ্টা করেছিলাম, বয়েসের অজুহাতে সুযোগ পেলাম না, সকলেরই  
ড্যাশিডুশি মেয়ে চাই l এখন আমি আর আমার ছেলেই থাকি, ছেলে কলেজে বেরিয়ে গেলে ভীষণ একা লাগে , মাঝে মাঝে অবশ্য দুর্গাপুরে মায়ের সাথে দেখা করতে যাই l কিছুই করার নেই তাই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করি, এই ভাবেই সময় কেটে যায় l

সেই প্লাবনে-- সাবিত্রী দাস

সেই প্লাবনে
সাবিত্রী দাস 

সমুদ্র নিয়ে  অমিতার মনে বেশ একটা  রোম্যাণ্টিক ভাবনাই ছিল বলতে গেলে । আসলে ঐ ভাবনাটা এসেছিল   দুবছর আগে ছাব্বিশে জানুয়ারি রজতের সঙ্গে পুরী গেছিল, সেই তখন থেকেই। সমুদ্র সৈকতে ঝিনুক কুড়িয়ে বেড়িয়েছে কোনদিন , কখনো আবার পায়ের পাতা জলে ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে।পায়ের তলা দিয়ে একটা শিরশিরে অনুভূতিতে হয়েছে রোমাঞ্চিত। পায়ের তলার বালি গুলো সুড়সুড় করে সরে সরে যাচ্ছিল আর ততই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছিল। দেখেছিল মাছ ধরা ডিঙিগুলো কেমন ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে এগিয়ে আসে । সেই তখন থেকেই অমিতা  স্বপ্ন দেখত  সমুদ্রের  ঢেউয়ের তালে তালে  দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে ।

                তাই বলে সেই  স্বপ্ন যে তার এমন করে সত্যি হবে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারে নি অমিতা।

ভয়ঙ্কর এই ঘূর্ণাবর্ত কোথায় নিয়ে আছড়ে ফেলবে তাকে, আতঙ্কে দিশাহারা অমিতা ভাবতেই পারছে না, আসলে ভাববার মতো মনের অবস্থা তার আর নেই।

     রজতের সঙ্গেই এসেছিল দীঘায়,সেটাও অমিতার ইচ্ছেতেই। রজত স্ত্রীকে  ভালোই চেনে। বাধা দিয়ে লাভ নেই জানে তাই ব্যাগ গুছিয়ে সঙ্গী হয়েছিল।
সতর্ক বার্তাও শুনেছিল হোটেলের ঘরে বসেই । তবুও রোমাঞ্চকর অভিযানের খোঁজে সকলের চোখ এড়িয়ে দুজনেই বেরিয়ে এসেছিল পায়ে পায়ে।
ঘুরপথে এসে দাঁড়িয়ে দূর থেকেই দেখছিল সমুদ্রের বিশাল বড়ো বড়ো ঢেউগুলো  সবেগে আছড়ে পড়ছে। ছাতা আড়াল করে  কয়েকটা ছবি তুলছিল, কী যে হলো হঠাৎ করে একটা বিশাল বড়ো ঢেউকে এগিয়ে আসতে দেখল, তারপরেই সব অন্ধকার! অমিতা এখন জলের তলায়, একবার ডুবছে একবার ভেসে উঠছে । হাতটা তুলতে চেষ্টা করলো ভীষন ভারী! একটা কোনোকিছুর সঙ্গে আটকে আছে। ভাসতে ভাসতে কতদূর চলে এসেছে বুঝতে পারছে না। এখানে জলোচ্ছ্বাস ততটা প্রবল নয়।একটু থিতু হতেই মনে হলো রজতের কথা ।সে কোথায়!
দেখলো তার হাত আটকে গেছে একটা বড়ো গাছের গুঁড়ির সঙ্গে,শুধু হাত নয় তার পুরো শরীরটাই এখন গাছের ডালপালা গুলোর সঙ্গে একসাথে ভাসছে। গাছের সঙ্গে  না আটকে থাকলে সে এতক্ষণে জলের তলায় পৌঁছে যেত। রজতের খোঁজে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে। 
এতক্ষণে নজর পড়ে ঐ গাছেরই একটা মোটা ডাল আঁকড়ে ধরে ভাসছে রজত।
এভাবেই ভেসে যাচ্ছে দুজনে। কতক্ষণ কে জানে!বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে সমানে, অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। অমিতার পাশদিয়ে সম্ভবতঃ একটা সাপ পেরিয়ে গেল। সমস্ত  শরীর ভয়ে শিরশির করতে থাকে। কোন কিছুর পচা দুর্গন্ধে গা ঘুলিয়ে উঠছে। বমি পাচ্ছে,ভীষণ বমি পাচ্ছে  অমিতার। 
 তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে , বড়ো অবসন্ন লাগছে, শরীর সায় দিচ্ছে না। এ জল তো এত নোংরা বলার নেই। রজতও বুঝতে পারছে অমিতা আর পারছে না। কী করবে সে!
যে করেই হোক  অমিতার কাছে  ওকে পৌঁছতেই হবে! 
এক হাতে ডালটা ধরে হাত বাড়িয়ে অন্য ডাল ধরে আস্তে আস্তে পা ঘষে ঘষে  ভয়ে ভয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। 
অমিতার কাছে গিয়ে ওর হাতের উপর হাতটা রাখতেই চমকে ওঠে রজত। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে যে! অমিতার মুখে কেমন একটা ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠে পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়।  কী করবে ভাবতে পারে না রজত, এই প্রথমবার নিজেকে ওর বড্ড অসহায় বলে মনে হয়। অমিতার শরীরটা কেমন যেন শিথিল হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে না! না না এ তার মনের ভুল, সেরকম কিছু হতেই পারে না অমিতার !
অমিতাকে অচৈতন্য দেখে ভয়ে আতঙ্কে একেবারে দিশাহারা  হয়ে যায়, সব শেষ  হতে বসেছে। যেটুকু আশা ছিল.......
  অমিতার জ্ঞান ফেরাবে কী করে!
  ভুলে যায় নিজের অবস্থান, দু হাতে ধরে ঝাঁকুনি দিতে যায় আর হাত ফসকে একবারে  অথৈ জলে। মুহুর্তের মধ্যে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল।
অচৈতন্য অমিতা এসব কিছুই জানতে পারলো না! গাছের সাথে আটকে জলপ্লাবনে ভেসে চললো সেও,একা! একেবারে একা!

নারী বাদ--জয়িতা ভট্টাচার্য

নারী  বাদ--
জয়িতা ভট্টাচার্য 

ফুলরেনু দেবী আজ ভীষণ ব্যস্ত।সকালে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ উল্টেই চানঘরে।আয়নায় আপাদমস্তক দেখে হাসি খেলে যায় ঠোঁটে। তারিফ করেন নিজের দেহ সুষমা দেখে নিজেকেই।
এইজন্য রাহুল হবার পর বুকের দুধ দেননি।
সে এখন প্রবাসী।
শরীরের খাঁজে বিদেশী পারফিউম আর জামদানি শাড়ি,হাল্কা গয়না।মালতি খাবার নিয়ে আসে।টিংটিঙে রোগা,কালো,ফুলছাপ শাড়িতে রিফু।আজ তিনি খুব ব্যস্ত।বঙ্গ সমাজে ফুলরেণু নারীবাদী লেখিকা হিসেবে বিখ্যাত। নারী দিবসের অনেকগুলি অনুষ্ঠানে  আজ বক্তব্য রাখবেন।ক্লাবে যাবেন। সাদা বি-এম-ডব্লিউ মসৃণ গতিতে চলেছে। 
তিনি কখনও চাকরি করেননি।দরকার হয়নি।স্বামী বড়ো আমলা ছিলেন।সুশোভন আর তিনি একটা বাড়িতেই থাকেন দুটি ভিন্ন গ্রহের মতো বহু বছর।ফুলরেনু অন্যমনস্ক হয়ে যান।অনেক এঘর ওঘর হয়েছে শুধু সুশোভনই কেমন অচেনা রয়ে গেলো।  রাতে ফিরে দেখতে পেলেন সুশোভন বসার ঘরে,টিভি দেখছে,হাতে দামি হুইস্কি।
মাঝরাতে মালতির বেড়ার ঘর থেকে চিৎকারে তাঁর ঘুম ভেঙে গেলো।কাঁদছে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে মেয়েটা। বরটা বেকার,মাতাল।রাগে গনগনে ফুলরেনু  ছুটে যান মালতির ঘরে।মালতীকে আড়াল করে বকাবকি করতে থাকেন।তিরস্কার করেন লোকটিকে নিজস্ব তেজে।পুলিশকে খবর দিতে উদ্যত হন।মালতির গায়ে কালশিটে।
মাতাল ছোটু  একটু দমে যায়।পুলিশের কথা শুনে।কিন্তু, 
এতক্ষণ মালতি একটু থমকে ছিলো।পুলিশের কথায় হঠাৎ  সামনে এসে পড়ে। 
-'ইশ পুলিশে দিবে কী জন্যি আমি থাকতে অরে পুলিশে দিবে! সারা শরীরে মারের দাগ নিয়ে  মালতি জাপটে ধরে ছটুকে।
" আমার বর আমাকে মারবে বেশ করবে কার কী "।
ছোটু এখন জড়িয়ে আছে মালতীকে।বন্ধ দর্মার দরজার সামনে ফুলরেনু  কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।ধীরে ধীরে ঘরে ঢোকেন মাথা নিচু করে।
কী যেন নেই তার কাছে যা ওই মূর্খ মালতির ঘরে আছে।
                  🎭

উন্মুক্ত স্বর্গদ্বার--শংকর ব্রহ্ম

উন্মুক্ত স্বর্গদ্বার--
শংকর ব্রহ্ম

---------------------------


প্রায় তিন'শ বছর আগে অচিনপুরে এক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ থাকতেন।তা'র নিজের বলে কেউ ছিল না।নগরের কারও কোন বিপদ আপদ দেখলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন।তা'কে সকলেই খুব ভালবাসত।

   প্রচন্ড এক শীতের রাতে তার বাড়িতে পাঁচ জন অতিথি এলেন।তারা রাতটা সেখানে কাটাতে চাইলেন।ব্রাহ্মণ তাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন।বললেন,আপনারা বিশ্রাম করুন,আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছি।বলে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন, তার ঘরে তো পাঁচজনকে খেতে দেবার মতো কিছু নেই।পাঁকশালায় ঢুকে তার বিস্ময়ের অন্ত রইল না।হাঁড়ি ভরা খাবার।তা দিয়েই তিনি অতিথিদের সেবা করলেন।

       পরেরদিন সকালে অতিথিরা বিদায় নিতে চাইলেন। তাদের মধ্যে একজন জানতে চাইল, বুঝতে পেরেছেন, আমরা কা'রা?

ব্রাহ্মন বললেন,জানি না, তবে আপনারা সাধারণ কেউ নন। সেটা বুঝতে পেরেছি।

- হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন। আমরা দেবতা, আপনার উপর খুব খুশি হয়েছি।

আমরা হলাম, কার্তিক গনেশ বিষ্ণু শিব ব্রহ্মা।

আপনি একটি বর ব্রহ্মার কাছে চেয়ে নিন।

ব্রাহ্মণ তখন ব্রহ্মার কাছে এসে বললেন, 'হে প্রভু আমার বসার জন্য ঘরে যে টুলটি আছে, ওটাতে কেউ বসলে যেন আমি না বলা পর্যন্ত, সে উঠতে না পারে।'

- তথাস্তু।

কার্তিক বলল,আপনি এটা কি বর চাইলেন? যান আবার বিষ্ণুর কাছে গিয়ে অন্যরকম বর চান।

ব্রাহ্মণ বিষ্ণুর কাছে এসে বললেন,

'হে প্রভু,আমার বাড়িতে যে আম গাছটা আছে,ওটাতে কেউ উঠলে যেন,আমি না বলা পর্যন্ত, সে নামতে না পারে।'

বিষ্ণু বললেন, তথাস্তু।

বর চেয়ে ফিরে এলে, গনেশ রেগে বলল, আপনি আবার এটা কি বর চাইলেন?

যান এবার শিবের কাছে গিয়ে এমন কিছু বর চান,যাতে আপনার মঙ্গল হয়।

ব্রাহ্মণ শিবের কাছে এসে বললেন, 'হে প্রভু আমি যেন দাবা খেলায় কখনও কারও কাছে না হারি।'

শিব বললেন, তথাস্তু।

ব্রাহ্মণের এইরকম বর চাওয়া দেখে, কার্তিক গনেশ খুব বিরক্ত হলেন। কোথায় নিজের মঙ্গলের জন্য কিছু চাইবেন ,তা না করে হাবিজাবি কিছু বর চাইলেন ব্রাহ্মণ। তারা ব্রাহ্মণ কে বললেন, আপনি খুবই ভাল মানুষ, তবে বড্ড বোকা। বলে তারা সকলে বিদায় নিলেন।


        তারপর বহুদিন কেটে গেছে। ব্রাহ্মণের বয়স যখন আশি, হেমন্তের এক পাতাঝরা রাতে, তার দরজায় এসে কে কড়া নাড়ল। ব্রাহ্মণ দরজা খুলে দেখেন, সামনে একজন কালো কদাকার কুৎসিত লোক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ।

ব্রাহ্মণ বলল, কি চাই?

- আমি যমদূত, আপনার জীবনের মেয়াদ শেষ হয়েছে, আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি আমি।

ব্রাহ্মণ বললেন, বেশ,  তবে আমি প্রস্তুত হয়ে আসি, আপনি এই টুলটায় বসে ততক্ষণ বিশ্রাম করুন।

যমদূত বলল, ঠিক আছে, আপনি তাড়াতাড়ি করুন।

ব্রাহ্মণ একটু মুচকি হেসে বললেন, আচ্ছা, বেশ।

একটু পরেই ভাল জামা কাপড় পরে বেরিয়ে এসে ব্রাহ্মণ বললেন, চলুন তবে।

যমদূত যেই টুল থেকে উঠতে যাবে , আর  কিছুতেই উঠতে পারল না।

সে খুব রেগে গিয়ে বলল, এ আপনি কি করেছেন?

ব্রাহ্মণ হেসে বললেন, ওটা মন্ত্রপূত টুল।

আমি না বলা পর্যন্ত উঠতে পারবেন না।

রাগে দুঃখে যমদূত বলল, আপনি কি চান তবে?

- আগামী একশ' বছর আপনি আমার ধারে কাছে আসবেন না।

- ঠিক আছে, বলে যমদূত বিদায় নিল।

একশ' বছর পর আবার যমদূত এসে হাজির হল। বলল, আপনি এবার তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিন, আমি অপেক্ষা করছি বাইরে ।

- বেশ, আপনি ততক্ষণ বরং গাছের কয়েকটা আম খান, আমি তো চলেই যাব, কে আর এ'সব খাবে বলুন ?

যমদূত দেখল ,গাছে আমগুলি পেকে সিঁদুরে রঙ ধরেছে। সে লোভে পড়ে গাছে উঠে কয়েকট আম পেড়ে খেয়ে দেখলেন, অপূর্ব স্বাদ, গন্ধে মনটা ভরে যাচ্ছে।

একটু পরেই ব্রাহ্মণ এসে বললেন, চলুন এবার তাহলে ।

যমদূত গাছের থেকে আর নামতে পারল না। সে রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল, কি করেছেন আবার আপনি ?

ব্রাহ্মণ হেসে বলল, এটা মন্ত্রপূত গাছ, আমি না বলা পর্যন্ত নামতে পারবেন না।

যমদূত রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, কি চান এবার আপনি?

- আগামী একশ' বছরের মধ্যে যেন আপনার মুখ আমায় দেখতে না হয় ।

যমদূত ঠিক আছে বলে, রাগে দুঃখে বিদায় নিল।

      একশ' বছর পর আবার যমদূত এসে হাজির হল । এবার সে সাবধান ও সতর্ক খুব। এবার সে আর কোন ভুল করবে না। 

     ব্রাহ্মণ দাবার ছক আর ঘুটিগুলো নিয়ে বেরিয়ে এলেন। পিছে ফিরে বাড়িটার দিকে তাকালেন। প্রায় তিনশ' বছর এই বাড়িটার সাথে তার নাড়ির টান। বড় মায়াটান অনুভব করলেন, বিষন্ন আবেগ তাকে গ্রাস করল।

     যমদূত দাবার ছকটা দেখে বলল , কি ব্যাপার এটা সঙ্গে নিয়েছেন কেন?

- অনেক দূরের পথ, ক্লান্ত হয়ে গেলে, গাছের ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিয়ে, একহাত দাবা খেলে নেওয়া যাবে।

যমদূত বলল, আমি তো কোন বাজি ছাড়া দাবা খেলি না।

ব্রাহ্মণ বলল, বেশ তবে তাই হবে। আমি রাজী। কি বাজি?

যমদূত উপহাসের সুরে বলল, আমি যদি জিতি তবে তোমার আত্মাটা আমাকে দিয়ে দিতে হবে।

ব্রাহ্মণ বললেন,আর যদি আমি জিতি?

- আপনি যা চাইবেন,তাই পাবেন।

- আমাকে নরক থেকে একশ' আত্মা এনে দিতে হবে।

যমদূত ব্যাঙ্গের সুরে বলল, বেশ তাই হবে।

যমদূতের আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছিল, তার চেয়ে দক্ষ আর কেউ নেই দাবা খেলায়, যে তাকে হারাতে পারবে।

কিন্তু ব্রাহ্মণের কাছে ছিল, শিবের দেওয়া বর।

প্রথমবার যমদূত কিছু বোঝার আগেই হেরে গেল। একশ' আত্মা যমালয় থেকে ছাড়া পেল। আবার খেলা শুরু হল। আবারও হারলেন। আরও একশ' আত্মা ছাড়া পেল। যমদূত যত খেলায় হেরে যেতে লাগল, তত তার জেতার জন্য জেদ আরও মনে চেপে বসল। এইভাবে বারবার হারার পর আর দেবার মতো কোন আত্মা সেখানে রইল না। যমালয় সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেল।

ব্রাহ্মণ বলল, তবে এখানেই আমাদের যাত্রা শেষ। যমদূত কোন উত্তর দিল না।

          ব্রাহ্মণ সব আত্মা নিয়ে এবার চলল স্বর্গের দিকে। স্বর্গের দ্বারে এসে পৌঁছাতেই দ্বাররক্ষী আটকালো তাকে।

ব্রাহ্মণ নিজের পরিচয় দিলেন। সব শুনে দ্বাররক্ষী বলল, ঠিক আছে, এতজনকে নিয়ে তো আপনি ঢুকতে পারবেন না। আপনি একা ঢুকতে পারেন।

ব্রাহ্মণ বললেন, ঠিক আছে। আপনি তবে একবার ব্রহ্মার কাছে একটা কথা জিজ্ঞাসা করে আসুন।

দ্বাররক্ষী বললেন, কি?

ব্রাহ্মণ বললেন, এক শীতের রাতে তিনি তার চার সঙ্গী নিয়ে আমার বাড়িতে এসেছিলেন, আমি তাদের আপ্যায়ণের কোন ত্রুটি রাখিনি, আর আজ আমি আমার সাথীদের নিয়ে এসেছি বলে, আমাকে একা স্বর্গে ঢুকতে হবে? তা'হলে কি আমি মনে করব, আমি তাঁর চেয়েও বেশী মহান?

দ্বাররক্ষী বলল, ঠিক আছে আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।

কিছুক্ষণ পর দ্বাররক্ষী ফিরে এসে স্বর্গের দ্বার খুলে দিয়ে, গম্ভীর স্বরে বললেন, প্রভু আপনাদের সকলকেই ঢুকতে বলেছেন।

ব্রাহ্মণ নিঃস্বার্থ বুদ্ধির জোরে সকলকে নিয়ে সানন্দে স্বর্গে ঢুকলেন।

স্ত্রী-- তৈমুর খান


স্ত্রী-- 
তৈমুর খান

ভোর থেকেই ডাক্তারখানায় মানুষের আনাগোনা। সকাল ৭-টা হলে একজন কর্মচারী কাগজ-কলম নিয়ে এসে হাজির হন। হাঁক দিয়ে বলেন: যারা ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, তারা একে-একে নিজের নাম ও ঠিকানা বলুন এবং ফিজের ৭০০-টাকা জমা দিন।
   তখন বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কে কার আগে নাম লেখাতে পারবে তারই প্রতিযোগিতা।

    আমি সবার আগে এসেও পারলাম না। আমার সিরিয়াল হল ৩০,অর্থাৎ সবার শেষে। রাত দুটোতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তা হোক, কী আর করা যাবে! চায়ের নেশা। ঘনঘন চা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দেবো।

   সারাদিন মানে! সারাজীবনই তো কেটে গেল!

 কয়েকটা কবিতার বই, চাকুরীবিহীন দুটি সন্তান-সন্ততি এবং রোগা-পটকা একটা স্ত্রী। সংসার কোনোদিন সচ্ছল হয়েছে? থাক সেসব কথা। পৃথিবীতে আর ক'টাদিনই বা আছি! হার্ট অ্যাটাক হতে হতে একবার ফিরে এলাম। আজ তারই চেকআপের দিন। সঙ্গের লোকগুলো একে একে সবাই চলে গেল। আমিও যাবার জন্য পথের মাঝখানে।

     দূরে কী একটা পাখি ডাকছে: মেঘ হোক! মেঘ হোক!

     হায়রে মেঘ! কত মেঘই না দেখলাম! কত বৃষ্টিতে ভিজলাম। কত বজ্রবিদ্যুৎ চোখ রাঙাল। বৃষ্টিভেজা নারীশরীর নিয়ে কত কবিতাই না লিখলাম। কত নক্ষত্র ফুটল। কত অদৃশ্য রূপসী উড়ে গেল মাথার ওপর। দোকানের এক কোণে বসে বসে কত কথাই মনে পড়ছে। কাগজ-কলম থাকলে এসব নিয়ে কবিতাও লেখা যেত। দুপুর গড়িয়ে গেছে। কত নম্বর সিরিয়াল চলছে গো?

      পাশ থেকে একজন বলল: ২৭ নম্বর।

     —তাহলে তো আমাকে এবার তৈরি হতে হবে!

      লোকটি বলল: একজন বিধবা ভদ্রমহিলা এসে খুব কাকুতি-মিনতি করছে ডাক্তার দেখাবে বলে, কিন্তু ডাক্তার ৩০-এর বেশি রোগী দেখবেন না।

 —কে ভদ্রমহিলা?

 কথা শুনেই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখি এলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে অর্জি। হ্যাঁ ঠিকই, অর্জি বেগম!

      তখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি। অর্জির দাদা আমার সহপাঠী। নানা ছুতোয় ওদের বাড়ি যেতাম শুধু অর্জিকে একঝলক দেখার জন্য। ওরকম বড় বড় চোখ, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, দুধে-আলতা রং কতই-না ভাললাগত। খুব অল্পদিনেই ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। যেমন করেই হোক অর্জিকে পেতে হবে। একটাই লক্ষ্য। একটাই সংকল্প। যেদিন পুকুরঘাটে ভেজাকাপড়ে ওকে স্নান করতে দেখতাম, কিংবা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টি পড়লে যখন ও খুব ছুটত, তখন আমার মনটা অস্থির হয়ে উঠত। ওর শরীরের লোভনীয় অংশগুলি যেন আকুল হয়ে ডাকত আমাকে। একখণ্ড শরীর কাপড়ের ফাঁকে জ্বলজ্বল করে উঠত। মনে হত ঐশ্বরিক আলোর বিভা। আমি চমৎকৃত হতাম। তাকে নিয়ে স্বপ্ন বেড়েই চলল। সেই অর্জি আজ বিধবা!

       মনে মনে আমিই তো কবেই তাকে বিয়ে করে নিয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমি তখন বিএ ক্লাসের ছাত্র। গরীব ঘরের সন্তান সব প্রস্তাব এককথায় নাকচ করে দিয়ে ওর বাবা বলেছিল: বামন হয়ে চাঁদে হাত!

      তারপর ভিন্ন জেলার এক গেরস্থ বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিল অর্জির। শুনেছি তিন মেয়ে তার। দুটির বিয়েও হয়ে গেছে।

        ছুটে এসে হাত ধরল অর্জি। কোনো ভুমিকা না করেই বলতে লাগল: তৈমুরদা, আমি ক'দিন থেকে খুব অসুস্থ। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছি। আমাকে ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করে দাও। ঠিক সময়ে আসতে পারিনি।

     বহুদিন পর তোমাকে দেখছি অর্জি! তোমার এরকম চেহারা দেখব ভাবিনি! ঠিক আছে এসো।

 ডাক্তারের চেম্বার থেকে ডাক এলো: সিরিয়াল ৩০, তৈমুর খান!

 —এইযে আসছি!

 —মেয়েটি কেন? একে তো ফিরিয়ে দিলাম!

 —আজ্ঞে! নামটি আমিই লিখিয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে দেখানোর জন্য!

    ডাক্তার অনেকক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে রইলেন আমাদের।



 ***তৈমুর খান, রামরামপুর(শান্তিপাড়া), ডাকঘর রামপুরহাট, জেলা বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। পিন কোড:731224, চলভাষ:9332991250

 ইমেইল: taimurkhan1967@gmail.com

দাগ--শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

দাগ--
শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার


আজ পূর্ণিমা বলে হাঁটুটা কাল রাত থেকে টনটন্ করে যাচ্ছে। সকালটা আজ উপোস রেখেছেন। তাই বলে শ্বশুরবাড়ির একমাত্র সম্বল  পেতলের বাল-গোপালের গায়ে একটু আবীর আর তার জন‍্য স্পেশাল নাড়ু প্রসাদে দিয়ে দেবেন যে স্নানের পরে সেটা অবশ‍্য আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে। 

এতগুলো বছরেও  তাঁর এদিনটা কখনো এসব আচারপালনে ব‍্যর্থ হয়নি। খালি দু-টো বছর, যার একটা হল ঊননব্বই সালের। সেবার  বছর চল্লিশের  ঘরোয়া গৃহবধূটির চেহারায় চিরস্থায়ী বদলের অভিজ্ঞান খোদাই হল। সেদিন ভালোয় মন্দয় মেশানো স্বামীর অকালমৃত‍্যু আর তারপর  পঁচানব্বই সালে এই তিথিতেই ওদের একমাত্র ছেলে যেদিন নিস্পন্দ ও চিরঘুমন্ত হয়ে ঘরে ফিরে  এসেছিল সেদিনও কিন্তু গোপাল তার নিজের জন‍্য  বরাদ্দ নারকেল নাড়ু আর এক পশলা আবীরের ফোঁটা কপালে দিয়ে অসার সংসারের মাঝে রঞ্জাবতী দেবীকে তার  বড় বড় স্থির দু-চোখে ক্রমাগত দেখতে দেখতে অভয়পদে ঠিক স্থান দিয়েছিল।

সেজন‍্য আজ এই বছর সত্তর বছর বয়সেও এসে  এই প্রচলিত অভ‍্যাসের  বাত‍্যয়টি ঘটেও নি আর ভবিষ‍্যতেও ঘটবেও না আশাকরি।
......

পুলকেশ বাবু ছিলেন কর্পোরেশনের কেরাণী।সে যুগে ওইসব কাজে মাইনেপত্তর কম ছিল বলেই হয়ত প্রয়োজনটাও হঠাৎ করে বেড়ে উঠতে শেখেনি। সেবার কর্তা   অ‍্যানজাইনায় হঠাৎ চলে গেলেন ঠিক দোলের দিন। সিঁড়ি দিয়ে দ্রত নামছিলেন মোড়ের দোকান থেকে রেডিওর জন‍্য চারটে ব‍্যাটারী কিনবেন বলে। কেবল সেদিন ওনার ওই দ্রুতপদে  নিষ্ক্রমণটা যেন আক্ষরিকভাবেই চিরকালের হয়ে রইল। কষ্ট লেগেছিল ভীষণ। এরপর ছেলের মুখ চেয়ে একপশলা লাল আর সবুজ আবীরের আঁচর মুছে নিদাগ সিঁথিটি আর পোড়া কপালটিকে নিয়ে একটু একটু করে সেদিনের পর থেকে বাঁচতে শিখেছিলেন। জীবননাট‍্য যে সেদিন ওসবে   শেষ হয়ে যায়নি তো !

কয়েকবছর পর বিপর্যয়ের দোল পূর্ণিমা আবার ফিরে এল। সেদিনের পরেও পূর্ণ চাঁদের মায়ায়  আবার শক্ত করে বুক বাঁধতে বাধ‍্য হলেন।

 ওঁদের একমাত্র ছেলে প্রণয় তখন কলেজে পড়ছে। ডায়মন্ড হারবার থেকে এক বন্ধুর মোটরবাইকে ফিরছিল তাদেরই একজনের পৈতৃক বাগানবাড়িতে বন্ধুদের  দোলের জমায়েত সেরে। 

যদিও দুই  বন্ধুর আর  আমতলার ওপারে ফেরা হয়নি সেদিন। সাবেকি ছাঁদের এই নফর কুন্ডু লেনের দোতলা বাড়িতে রক্তলাঞ্ছিত ও পোস্টমর্টেমের আঁচড়ে ভরা একটি শবদেহ ফিরেছিল। মনকে সেদিন বারবার বুঝিয়েছিলেন যে এ শবদেহটি ওঁদের প্রণয়ের  নয়, না..না...এ হতেই পারেনা... স্রেফ প্রণয়ের মত  অনেকটা দেখতে! 

কিন্তু  সে আপ্তবাক‍্য আর সত‍্যি হল কই! 


তবে দোলের নাড়ু আর আবীরের আদর ওনাদের  গোপাল  কিন্তু  সেদিনও কিন্তু  হিসাবে পেয়েছিল সকালবেলাতেই। 

....

এইবছর গোপালকে একটা নতুন জামায় খানিক সাজিয়ে আর খেতে দিয়ে এবার জানলায় এসে খানিক দাঁড়াতেই বাইরের রং খেলার হুল্লোড় কানে এল। আজ একটা বেলা কাজের মেয়েটিও ছুটি নিয়েছে  বলে রাতে আবার  উপোস করে শুয়ে পড়বেন বলেই ভাবা। দু'বেলার জন‍্য  কয়েকটা বেশী রুটি আর সুজি বানিয়ে রেখে দিলেই হত; তাও আর ইচ্ছা করেনি

রঞ্জাবতী তাঁর স্বামী আর পুত্রের চিরহাস‍্যমুখ নিন্দিত ছবি সামনে এসে দুটোর কাঁচে আলতো করে আঁচল বোলালেন। একচিমটে ধূলো উঠে ফ্রেমটা ঝকঝকে লাগছে বটে ; তবে পরে নিজেই অবাক হলেন।  দুপুরে স্নানের সময় কলঘরে কাপড় বদলে অন‍্য কাপড় পরেছিলেন তো! কই তখন তো এটা দেখেন নি!

এবার অবাক হলেন প্রচন্ড।তখন  স্পষ্ট দেখেছিলেন যে ছবিদুটোর ফ্রেম আর কাঁচের একটু কালচে ধুলো আঁচল দিয়ে মোছার সময় যেন একটু কোণটায় এসে লাগল।

 কিন্তু এখন যেটা দেখছেন সেটা তো অবিশ্বাস্য! 
ধবধবে সাদা আঁচলের একটা কোণা জুড়ে খানিকটা খানিকটা করে ছিটে লেগে আছে লাল আর সবুজ আবিরের টাটকা দাগ।

তখুনি অবাক হয়ে  ছুটে গিয়ে গোপালের সামনে এসে দাঁড়ালেন। 

হ‍্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন বছর সত্তরের রঞ্জাবতী দেবী। 

গোপালের কপালে তো গেরুয়া আবীরের ফোঁটা, লাল বা সবুজ রঙের নয় তো! 
....

জানালা দিয়ে একটা মাতাল করা নাম না জানা ফুলের গন্ধ হঠাৎ আসা একটা  চৈতালী ঘূর্ণির হাওয়ার সাথে  বারবার পাক খেয়ে যাচ্ছে।

 যা ভীষণরকমভাবে অনেকবছর আগের এক দোলের দিনে রঞ্জাবতী দেবীর  কপালে আর গালে লেগে থাকা লাল ও সবুজ আবীরের রঙটাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। 

আচ্ছা! কেউ কি সেদিন  জানত?

আর কিছুক্ষণ পরেই ওঁর সমস্তটাই এরপর থেকে   নিদাগ ও নদীর বুকের শুকনো খাতের মত হয়ে বাকি জীবনটা ধরে তপ্ত ও অবিচল হয়ে শুধু থেকেই যাবে! 

........

***Shyama P Sarkar
Ph : 8583829575

ঘুম-- বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

ঘুম
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

ঘুম আসছে না । পাশবালিশটা নিয়ে দুপায়ের মধ্যে জড়িয়ে এপাশ ওপাশ করছি । উঃ আঃ করে নাইট ল্যাম্পের আলোয় দেওয়ালের ওয়াল ক্লকে টাইম দেখতে চেষ্টা করলাম । ঘড়ির কাঁটা দুটোর কৌনিক অবস্থান আন্দাজ করে মনে হল রাত সাড়ে বারোটার একটু বেশি কিংবা আরও পাঁচ মিনিট বেশি । 
সন্ধ্যে রাতে ভারী এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে । তাই গরমটা কমে গিয়ে বেশ আরামদায়ক বোধ হলেও কিসব হাবিজাবি চিন্তা মাথায় ঢুকে ঘুরপাক খাচ্ছে ।  যতসব নষ্টামির চিন্তা । এসময় কোন রগরগে যুবতী মেয়ে যদি পাশে পেতাম ! 
নানা কারনে বিয়ে করে উঠতে পারিনি । তাই যৌবনের ডাক কেমন করে যে অগ্রাহ্য করে রয়েছি তা ভাবনায় ধাক্কা দিচ্ছে ।
কেমন যেন বিভোর অবস্থা । মাথায় কার হাতের নরম স্পর্শ পেলাম । একটা মিষ্টি গন্ধ , নারী শরীরে পারফিউম স্প্রে করে  কেউ আমার পাশে শুয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে শরীরে শরীর মিশিয়ে আমার মনের বিহ্বল বিভোর অবস্থা টের পেয়ে গেছে । আমি এখন তার হাতের ক্রীড়নক । 
মনে হচ্ছে আমার পুরুষাঙ্গ বের করে নিয়ে সে যথেচ্ছ খেলতে উন্মত্ত । 
আমার নষ্টামি চিন্তার এ কোন দোসর ! এ নারী তো শরীরী ভাষায় অশরীরী আত্মার নিপীড়ন ।
ফিসফিস করে বলল , শরীরের সান্নিধ্যে তুমি আমাকে বাগে পেয়ে যেভাবে মেরেছিলে আজকে সেভাবে আমার পালা , বুঝলে মশাই ।
আমি হাঁসফাঁস করতে লাগলাম ।  বললাম , মাপ করো , আমায় মাপ করো । আমি হয়তো ভুল করেছিলাম , তাই বলে তুমিও সেই একই ভুল করবে ? 
না এ ভুল নয় গো । এ হল প্রতিশোধ । তুমি একাই জিতে যেতে পারো না ।  আমি একটা মেয়ে ছিলাম শরীরী আত্মায় । তাই আমি একটা পুরুষ শক্তির কাছে হেরে যাবো । শক্তির জোর দেখিয়ে সব পুরুষরাই নারী শরীরকে দুর্বল মনে করে । আমি এখন সে মানব শরীরের ভাষায় তোমার লিপ্সা চরিতার্থ করব না । আমি তোমার সম্ভোগ লিপ্সা এমনভাবে চরিতার্থ করব যাতে তোমার অনিদ্রাজনিত নষ্ট চিন্তার অবসান ঘটে । আমিও তোমাকে পরিপূর্ণ ভাবে ভোগ করে চির ঘুম পাড়াব গো । 
তুমি ঘুমিয়ে পড়বে । আমাদের যৌন সম্ভোগ সন্তৃপ্ত হলেই তুমি চির নিদ্রায় ঢলে পড়বে ।
ঘুম আসছে , আমার ঘুম আসছে । অনেক দিন এমন ঘুম আসেনি । 
আমি ঘুমাতে যাচ্ছি । আমি চিরশয়ন শয্যায় ঘুমাতে যাচ্ছি । গুড্ নাইট । গুড নাইট । গুড নাইট ম্যাডাম ।



***লেখক  :  বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী 
ঠিকানা : গ্রাম  - বিশ্বনাথপুর
               পোস্ট -  রামনাথপুর
                জেলা  - উত্তর ২৪ পরগনা
                 পিন - ৭৪৩৪২৩
      মোবাইল - ৯৬৪৭১৩৮১২৬
        মেইল আইডি : biswajitroychoudhury672@gmail.com

ইচ্ছের দাম-- অরুণ চট্টোপাধ্যায়

ইচ্ছের দাম
অরুণ চট্টোপাধ্যায়

-অটো!

ঘ্যাঁচ করে কয়েক ফুট দূরে থেমে গেল অটোটা। চালক মুখ বাড়িয়ে পেছনে তাকাল।

দু’জন দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে অটোর দিকে। এদিকে আলো তেমন বেশি নেই। দুটো ল্যাম্প পোস্টের মাঝের একটা জায়গা। দুজনে হাঁপাহাঁপি করে উঠে বসল অটোতে। ভেতরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। দুজনে ব্যাগপত্তর একটু গুছিয়ে নিয়ে বসল। যুবক আর যুবতী দুজনের মুখেই যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যাওয়া আনন্দের হাসি।

-এত রাতে অটো পাব ভাবতে পারি নি। সোনালি গুছিয়ে বসেছ তো?

-হ্যাঁ গো হ্যাঁ। ওঃ বাবা দিব্যেন্দুর জন্যে এত দেরিটা হয়ে গেল। আবার বলছিল নাকি আজ রাতটা থাকতে। না বাবা এমনিতেই শরীর যা ক্লান্ত। সুব্রত তুমি পানটা নিয়েছ তো?

-তা আর নোব না? আমার সোনালি সুন্দরী পান খেতে কত ভালবাসে তা কি আমি জানি না?

-তাই তো বলছিল দিব্যেন্দুর বৌ। বলল কত্তাটি তোমাকে যা ভালবাসে দেখবে ঠিক পানের মোড়া তোমার জন্যে নিয়ে যাবে। আর-

সুব্রতর মুখেও খুশির হাসি, আর কি শুনি?

সোনালির মুখে হাসি আর ধরে না। ফিসফিস করে বলল তোমার কত্তা পান খাইয়ে তোমার লাল ঠোঁট কখন দেখবে সেই জন্যে একেবারে ছটফট করছে।

খিল খিল করে হাসল সোনালি। সুব্রতর মুখেও রাঙ্গা হাসি।

-আরে তুমি কেন হাঁ করে আমাদের কথা শুনছ? অটোটা একটু জোরে চালাও না। আমাদের ফিরতে তো এমনিই রাত হয়ে গেছে।

ড্রাইভার এতক্ষণ ধরে বাইরের আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়নায় সোনালির সুন্দর মুখের প্রতিবিম্ব। ব্যাগ খুলে পান বার করে দিয়েছে সুব্রত। চিবিয়ে চিবিয়ে ঠোঁট লাল করে ফেলেছে। তার কস বেয়ে লালের একটা সরু ধারা আর চালকের জিভ সরস হয়ে উঠেছে।

-কোথায় নামবেন?

সুব্রত বলল, চিকুরের মোড় পেরিয়ে একটা স্টপেজ।

-চিকুরের মোড় যাবে না। ওদিকে রাস্তা খারাপ আছে।

ভ্রূ কোঁচকাল সোনালি আর সুব্রত দুজনেরই। সুব্রতর বিরক্তিতে আর সোনালির ভয়ে।

তারা দুজনে দুজনের দিকে চাইল।

-তবে?

-এই রাতে আর হেঁটে যেতে পারব না ভাই। একটু বেশি পয়সা দিতে হয় তো দেব। সোনালি বলল।

-বেশি পয়সা দিতে হবে না। একটু বেশি হাঁটুন। চিকুর মোড়ের আগে রাস্তা খুঁড়েছে। সব গাড়ি চম্পাহাটি মোড় দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে।

-বললেই হল চম্পাহাটি মোড়? সোনালি রেগে উঠল, এই তো সকালে আমার এক বান্ধবী কলেজ থেকে গাড়ি নিয়ে ফিরল। আমাদের কি বোকা পেয়েছ।

-আঃ সোনা কি হচ্ছে? ও যখন বলছে তখন কথাটা তো আর মিথ্যে হতে পারে না? ঠিক আছে ভাই তাই চল।

ভয়ে সোনালির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কিছুটা ফিসফিস করে বলল, এখন রাত কত হয়েছে জান? মোবাইল বার করে সুব্রত বলল, রাত একটা পঁয়ত্রিশ।

-তবে? রাস্তাটা একেবারে শুনসান। গাড়িও তেমন চলে না।

-আজ চলছে। তাদের কথার মধ্যেই কথা বলল চালক, আজ তো মেন রাস্তাটা খোঁড়া। তাই সব ঘুরে যাচ্ছে।

বলতে বলতেই এসে পড়ল মোড়টা। সোজা রাস্তাটা চলে গেছে চিকুর মোড়ের দিকে। আর বাঁয়ের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় ধড়াস করে ঢুকে পড়ল অটোটা।

তাদের পেছনে একটা গাড়ি আসছিল। সেটা কিন্তু সোজা বেরিয়ে গেল বড় রাস্তা ধরেই। সোনালি আবার চেঁচিয়ে উঠল, আরে ওই তো ওই গাড়িটা চলে গেল।

-ওটা চিকুর মোড় পর্যন্ত যাবে না। চালকের গম্ভীর স্বর।

--তুমি কি করে জানলে? বাজে কথা বলছ। আবার তর্ক তুলল সোনালি।

তাকে শান্ত করতে সুব্রত বলল, আহা কেন বাজে তর্ক করছ সোনা? ও তো ড্রাইভার নাকি? আমাদের থেকে কম জানলে ওদের চলে বল? চল ভাই তুমি চল। ঘুরে গেলে নাহয় পাঁচ দশ মিনিট দেরি হবে এই বই তো নয়? কত আর বাজবে? দুটোর মধ্যেই ঠিক পৌঁছে যাব কি বল?

চালক কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগল। একটা প্রায় পান্ডব বর্জিত জায়গা। সেই আধা অন্ধকারে যেন শ্মশানের মত লাগছে। কিন্তু বেশ কিছুটা দ্রুত গতিতে এসে অটোটা থেমে গেল।

সোনালি ভয়ে ভয়ে তাকাল সুব্রতর দিকে। সুব্রত কড়া স্বরে বলল, কি হল আবার?

চুপ করে দশ কুড়ি সেকেন্ড বসে থেকে উঠে পড়ল চালক। নামল অটো থেকে আর হাত দিয়ে ধরে অটোটাকে রাস্তার অনেক বাঁয়ে নিয়ে এল। তারপর দ্রুত চলে এল পেছনের সিটের দিকে। সোনালি ছিল ভেতরের দিকে। সুব্রত প্রশ্ন করল, কি ব্যাপার?

- স্পার্ক প্লাগ পাল্টাতে হবে মনে হয়। আপনি একটু উঠুন তো দাদা। যন্ত্রপাতি নিতে হবে।

তড়িঘড়ি উঠে পড়ল সুব্রত।

-আপনি বরং সামনের সিটে ততক্ষণ বসুন গিয়ে। আমার কাজ শেষ হলে আবার এসে বসবেন।

সুব্রত চলে যেতেই সোনালি নামতে যাচ্ছিল। চালক প্রায় ধমকে বলে উঠল, আপনাকে নামতে কি বলেছি ম্যাডাম? আপনি বসে থাকুন।

তার কড়া কথাটায় একটু অপমানিত বোধ করল সোনালি। চোখ তুলে তাকাল সুব্রতর দিকে। সুব্রত চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, কোনও ভয় নেই।

এই সময় পাশে আর একটা অটো এসে একেবারে তাদের অটোর গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

-হবে নাকি গুরু? সে জিজ্ঞেস করল।

-হচ্ছে তো। তাদের চালক বলল, একের পর এক। হড়বড় করবি না কেলো।  হড়বড় করে গাড়ি সারালে আবার মাঝরাস্তায় কোথায় বিগড়ে যাবে তার ঠিক নেই।

গাড়ি কতক্ষণে ঠিক হবে ভেবে শিউরে উঠল সোনালি।

-কেলো আমি ইঞ্জিন দেখছি। তুই ক্লাচটা সামলা।

বলে অটোর ওপরে উঠে পড়ল চালক। সোনালিকে বলল, আপনি পা তুলুন তো ম্যাডাম। দুটো পা। নিচে প্লাগটা গড়িয়ে পড়ল। খুঁজতে হবে।

কিন্তু দুটো পা তুলে রাখবে কোথায়? সোনালি বেশ বিরক্ত। চালক প্রায় ধমকে বলে সিটে শুয়ে পড়ুন না। আমাকে নিচে খুঁজতে হবে।

সোনালি ইতস্তত করছে দেখে সে জোর করে সোনালিকে শুইয়ে দিল সিটে। সোনালি আপত্তি করতেই চালক আবার ধমকে বলল, চুপ করুন। আপনার বাজে কথা শোনার জন্যে এত রাত্তিরে কেউ নেই।

সুব্রতর পিঠে হঠাৎ একটা ধাতব অনুভূতি। 

-চুপ করে নিজের সিটে বসে থাকুন স্যার। এটা দিশি তাই বিশ্বাস নেই। পায়ের জায়গায় বুকে বা মাথায় লাগলে আমাকে দোষ দেবেন না কিন্তু।

খোঁচাটা কিসের তা বুঝে গেছে সুব্রত। চুপ করে উঠে বসল ড্রাইভারের পাশের সিটে।

এদিকে সোনালির সঙ্গে চলেছে চালকের ধস্তাধস্তি। কেলো সুব্রতর দিকে তার দিশি তাক করে রেখে নজর রাখছে রাস্তায়। চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ, একটা অটো আসছে গুরু।

-অটো! চঞ্চল হল চালক।

একটা নয় তিন তিনটে অটো এসে ঘিরে ধরল এই অটোটাকে। তিনটে চালক এগিয়ে আসার আগেই ততোক্ষণে আসল রিভলবার হাতে এসে গেছে পুলিশের মেজবাবু শশধর সামন্তের হাতে। তিন অটো চালক মানে দুই কনস্টেবল আর এক এ এস আই এগিয়ে এসে নেমে গেছে ফিল্ডে।

এ এস আই নিখিল এগিয়ে এসে বলল, ম্যাডাম আপনার কিছু হয় নি তো?

থানার ফার্স্ট অফিসার ম্যাডাম নীহার বসু হাসিমুখে উঠে বসে বললেন, হতে পারত। তোমাদের পাংচুয়ালিটি আমাদের ফোর্সের গর্ব।

সেকেন্ড অফিসার সুব্রত ওরফে মিঃ সামন্ত বললেন, অটোর মাথার বাঁ দিকের কোণে দেখ চিপসটা লাগানো আছে। ওটাই মেন ডকুমেন্ট। আদালতে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে।

ম্যাডাম উঠে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। একমাস ধরে চলা একটা কুনাট্যের এই রজনীতে অবসান। গভীর রাতে যাত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অটোকে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে মলেস্ট করা হচ্ছিল মেয়েগুলোকে। তাদের চোখে জল ধরিয়ে মজা লুঠছিল দুটো আপাত-নিরীহ অটো চালক।

লাভ জেহাদ-- তপন তরফদার

লাভ জেহাদ
তপন  তরফদার
 
আদিম যুগ থেকেই লাভ জেহাদের বিষয়টি মানুষের মনে গেঁথে গেছে।   ভালোলাগা আর ভালোবাসা,  এই নিয়ে সেই আদম ইভদের যুগ থেকেই আমরা ধন্দে আছি। ধন্দ আরও বাড়িয়ে তুলেছে আজকের আদালত।

          মেয়ের বিরুদ্ধে বাবা, ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে বাবার বিরুদ্ধে মেয়ে। মেয়েই এখন কাঠগড়ায়। দর্শকদের চোখে-মুখে আহ্লাদের হাসি। যত বেশি কথা চালাচালি হবে তত বেশি কেচ্ছা শোনা যাবে।

                 খুব দরদি গলায় মেয়েটি বলতে শুরু করলো, ধর্মাবতার আমার কর্তব্য সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। আমি গীতা ছুঁয়ে শপথ নিয়েছি। মিথ্যাচার কে আমি ঘৃণা করি।

প্রথমেই আপনার কাছে বিনম্র প্রার্থনা,প্রতিটি ঘটনার সঠিক মূল্যায়ন চাই। লক-আপের মধ্যে রয়েছে যে যুবক তার সম্পর্কেই সাক্ষ্য দিতে হবে আমাকে। ভয়ঙ্কর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। আপনার রায়ের উপর নির্ভর করছে আমাদের জীবন।

                    মেয়েটি একটু  দম নেওয়ার জন্য থেমেছে।শ্যামলা রঙা, দোহারা চেহারা।  চোয়াল এবং চিবুক উঁচিয়ে আছে প্রতিস্পর্ধায়। হাতে প্লাস্টিকের শাঁখা-পলা। কপালে ও সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুর।

                          আমার নাম মাধুরী। আমি এক গরিব পূজারী ব্রাহ্মণের কন্যা। শুনেছি আমার জন্মে বাবা খুশি হননি। ব্যাজার হয়েছিলেন তাঁর পরিবারের লোকজনও। ওনাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল পুত্র সন্তান। কিন্তু হলাম কন্যা। আমার জন্মের পর বাড়িতে শাঁখ বাজেনি। পুত্রসন্তান উপহার দিতে না পারায় মাকেও বহু গঞ্জনা শুনতে হয়েছিল। আমাদের সমাজে এটিকেই স্বাভাবিকই বলা চলে।

                           ধর্মাবতার, এই মামলার সঙ্গে  অভিযুক্ত করা হয়েছে  যুবকের বৃদ্ধ মা বাবাকেও। যিনি ঠিক পল্লীগ্রামের মানুষের অবয়ব। পরনে আধময়লা লুঙ্গি,গায়ে জীর্ণ হাফহাতা শার্ট। আবার  এজলাসে এই মুহূর্তে আমার বাবা, কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন সহ বাবার অনুগামীদের দেখতে পাচ্ছি। বাবা ডায়েরি করেছেন  আমার স্বামী আব্দুল রেজ্জাক  এবং ওর পরিবারের লোকজন আমাকে “কিডন্যাপ” করে আটকে রেখেছে। মহামান্য  বিচারপতি এখানে পুলিশের অতি সক্রিয়তা লক্ষ করেছেন। বাবা অনেক উৎকোচ  দিয়েছেন পুলিশকে। বাবার সামাজিক সমস্যা হয়েছে  আমি মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে কলঙ্কিত করেছি আমার পরিবারকে। আমি কেন আব্দুলকে বিয়ে করেছি আপনার কাছে  নিবেদন করবো।

                           তখন আমি  ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। টিউশনি থেকে ফিরছি। সাইকেল পাংচার হয়ে যায় রাসমণি প্রাইমারি স্কুলের আগে। স্কুলের বারান্দায় কারা। কিছু  বোঝার আগেই চারজন ঘিরে ধরে বলে সাইকেল সারিয়ে দেবে। আমাকেই টেনে অন্ধকারময় গাব গাছের তলায় টেনে  নিয়ে যাচ্ছে। ওদের মুখ  দেখে আমি চিনতে পারি ওরা  এই গ্রামেরই বর্ধিষ্ণু পরিবারের বখাটে  ছেলে। এখানে মদের আসর বসিয়েছে। আমি  বিপদ বুঝতে পেরে চিৎকার করতে থাকি। আমার ভাগ্য ভালো। আব্দুল  ওই রাস্তা দিয়ে  যাচ্ছিল। ও এগিয়ে আসে। ছেলেগুলো ওকে ঘিরে ধরে। বচসা শুরু  হয়। আব্দুল দমবার পাত্র নয়। হাতাহাতি শুরু  হয়ে যায়। আব্দুল বলে মাধুরী তুমি পালিয়ে যাও, এরা তোমার সর্বনাশ করবেই।  একজন শক্ত একটা  গাছের  ডাল দিয়ে সজোরে ওর মাথায় মারে। আব্দুল মাটিতে পড়ে যায়। ওরা চারজন মিলে বেধড়ক মারতে থাকে।  আমি  দৌড়ে বাড়িতে এসে বাবাকে সব বলি। বাবা বলেন, চুপচাপ থাকবি। কথাটা ভুলে ও মনে আনবি না বদনাম হয়ে যাবে। সবাই রসিয়ে রসিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেবে। আমরা মুখ দেখাতে পারবোনা।

        পরের দিন গ্রামের আলোচনার বিষয় আব্দুল কোনও এক মেয়েকে ফুসলে এনেছিল ফূর্তি করতে। ধরা পরে যায়। মেয়ের বাড়ির লোকেরা ওকে মেরে মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। কোন মেয়ে, কারা মেরেছে  খোঁজ করেনা  আমাদের হিন্দু  গ্রামের লোকজন। সবাই খুশি একটা মুসলমানকে মেরে উচিতৎ শিক্ষা দিয়েছে।

          আব্দুলের অবস্থা ভালো নয়। ওর পরিজনরা কলকাতায় নিয়ে যায়। যমে মানুষে টানাটানি।  অবশেষে বেঁচে যায় কিন্তু  বাঁপায়ের মালাইচাকি ঠিকমতো সচল হয়না।  ঠিক মত হাঁটতে পারেনা।  আব্দুল  লেখা পড়ায় ভালো। দুস্থ পরিবারে জন্ম। পড়াশোনার খরচ চালাতে নিজেই কোচিং সেন্টার  খুলছে ।কম পয়সায় পড়ায়। মুসলমানদের হাতে  জল খেলে জাত যায়, কিন্তু   দুধে  জাত যায়না। কম পয়সায় ভালো পড়ায় তাই হিন্দুদের ছেলে মেয়েরা ও পড়তে আসে।  আবদুল টিউশনি করে আর সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতার পরীক্ষায় বসে।

         মাধুরীর চোখে মুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ। আব্দুলের মনে কোনো আক্ষেপ নেই। একদিন মাধুরী নিজেই সে দিনের কথা তুলে কৃতজ্ঞতা জানায়। আব্দুল বলে, ওসব ভুলে যাও। মাধুরী বলে আমার জন্যই সারাজীবন আপনার ভোগান্তি। আব্দুল বলে, মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা কখন ঘটবে কেউ বলতে পারেনা।

               মানুষ কখন ভালোবাসার জালে জড়িয়ে পড়ে  কেউ বলতে পারেনা। আর সেই প্রেম যদি  খাপছাড়া হয় তার বাঁধুনি কতটা মজবুত তা আমরা ইতিহাসে পড়েছি। মাধুরী  আর আব্দুলের বিষয়টি কিছু  পড়ুয়া বুঝতে পারে। মাধুরীর বাবা  ত্রিলোচনের কানে  পৌঁছে যায়। মাধুরীকে আর পড়তে পাঠায়না।

     ঈশ্বর আছেন  আল্লাহ আছেন। আব্দুল উচ্চ -প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরি পেয়ে যায় পাশের গ্রাম তক্তাপোলে। ওরা কিভাবে যোগাযোগ রাখে কেউ বুঝতে পারেনা। ডুবে ডুবে  জল খায় শিবের বাবাও টের পায়না। শিবের মাথায় জল ঢেলে শিবরাত্রির দিন মাধুরী কোথায় গেল কেউ খুঁজে পায়না। দুদিন বাদে জানা গেল ওদের দুজনকে দীঘায় দেখা গেছে। ত্রিলোচন চোখে ধুতরো ফুল দেখে, আত্মসম্মান ধুলোয় মিশলো,উপরন্তু যজমানি বাড়িগুলো হাতছাড়া হয়ে যাবে। ওরা আর ডাকবেনা।

        পুরোহিতরা জানে মূল্য ধরে  দিলে সাতখুন মাফ। সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ত্রিলোচন দারোগাবাবু কে উপযুক্ত নজরানা দিয়ে ডায়েরি করে দেয়।  দারোগারা জানে কান টানলেই মাথা চলে আসবে। আব্দুলের বৃদ্ধ আব্বাজান ও আম্মাকে সিধে গারদে ঢুকিয়ে দেয়। ম্যজিকের মত কাজ হলো সুড়সুড় করে  আব্দুল থানায়  হাজির হলো। কিন্তু  ত্রিলোচনের কাজের কাজ কিছুই হলোনা। মাধুরীকে ঘরে তোলাতো দূরের কথা ওকে খুঁজেই পাওয়া গেলনা।

       পুলিশ কোর্টে চালান করে দিয়েছে। ত্রিলোচন দুঁদে উকিল লাগিয়েছেন এমন কেস সাজিয়েছে যাবজ্জীবন জেল নিশ্চিত। কোনো দিন আর কোনো মুসলমান  ছেলে হিন্দু মেয়েদের দিকে তাকাবারই সাহস পাবেনা। কেসটা এখন আড়াআড়ি ভাবে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হয়ে গেছে।

        ধর্মাবতার, আমি  জানতাম আমার পরিবার  আমাকে সমর্থন করবেনা। তাই বাবার আপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই আমরা বিয়ে করলাম। দেশের আইন মেনেই। তারপর একবস্ত্রে চলে গেলাম শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুর-শাশুড়ি আমায় বুকে টেনে নিয়েছেন। কন্যার আদর দিয়েছেন। দিয়েছেন পুত্রবধূর প্রাপ্য মর্যাদা।

             ওরা আমার স্বামী এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করেছে।   অপরাধ? আমার বাবা থানায় নালিশ ঠুকেছেন। আমার  আব্দুল  নাকি আমাকে অপহরণ করেছে। ফুঁসলিয়ে বিয়ে। শুধু তাই নয়, জোর করে আমার ধর্ম পরিবর্তন করে দিয়েছে। এটা নাকি লাভ জেহাদ। স্বামীর বৃদ্ধ বাবা-মা ওই অপকর্মে ছেলেকে সাহায্য করেছে। সেজন্য তাঁরাও অভিযুক্ত। ওই দেখুন, ওই তিনজনই এই মুহূর্তে আপনার কোর্ট লক-আপে।

          ধর্মাবতার! আপনাকে জানাচ্ছি, আমি স্বেচ্ছায় স্বামীর ধর্ম গ্রহণ করেছি। আমি নিষ্ঠাবান হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া এক নারী। যে পরিবারে শেখানো হয় স্ত্রীকে প্রকৃত স্বামীর সহধর্মিনী হতে। না হওয়াটাই  ক্ষমাহীন অপরাধ, সীমাহীন পাপ। আমি সেই অপরাধ, সেই পাপ করতে রাজি নই। তাছাড়া, স্বামীর সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা, স্বাচ্ছন্দ্য, প্রেম, ভালোবাসা সমস্ত কিছু যখন গ্রহণ করছি, তখন তাঁর ধর্মটা গ্রহণ করতে দ্বিধা থাকবে কেন! আমি কোন অপরাধ করিনি।

           আর, লাভ জেহাদের কথা বলছেন? হ্যাঁ ধর্মাবতার। আমরা লাভ জেহাদই করেছি। শুনেছি জেহাদ মানে ধর্মযুদ্ধ। আমরা ধর্মযুদ্ধই করতে চাই। মানবতার পক্ষে ধর্মযুদ্ধ। নারী-পুরুষের পবিত্র প্রেম ভালোবাসা দিয়ে। আমাদের ভালোবাসার ফসল হয়ে সন্তান আসবে। সেই সন্তানের ধর্ম হবে মানবতা। সেই ধর্মের জোরেই সে একসময় পূর্ণ হবে কারও অকৃপণ প্রেম-ভালোবাসায়। যে সুমহান নিজের জীবন দিয়ে মেয়েদের ইজ্জত বাঁচায় সে সকলের ঊর্ধ্বে। আমার মনের মানুষের সঙ্গে   মানবতার ভালোবাসাই তো লাভ জেহাদ।

দাগ-- অলভ্য ঘোষ

দাগ
অলভ্য ঘোষ

নেতা কে নিয়ে মৃতের পরিবারের কাছে গেছিলেন কেষ্ট মস্তান সাথে মিডিয়া।যতবারই মৃতের আত্মীয়-স্বজন নেতা কে তার বুকফাটা দুঃখের কথা বলতে যায়।ততবারই কেষ্ট দাবড়ানি দেয় খিচুড়ি স্কুলের মাস্টারমশাই এর মত।

-কিচ্ছু বলতে হইবেক লা।চিপ মিনিস্টার আছে লা।আমি আছি লা।কোন চিন্তা লাই।

বাড়ি পুড়িয়ে মেরে ফেলা শিশুর মা বলতে চায়;
-আমার ছেলে-ডা কে কি তোমার মুখ্যমন্ত্রী ফিরায়ে দিতে পারবে বাবু।

স্বামী খুন হয়ে যাওয়া মৃতের বউ বলতে চায়;
-খুনিডাতো প্রকাশ্য দিবালোকে।আপনার সাথে সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাবু।পুলিশ মন্ত্রী কি পারবেক আমার সোয়ামী ডার খুনিকে শাস্তি দিতে?

সান্ত্বনার জায়গায় প্রকাশ্যে মিডিয়ার সামনেই কেষ্টকে ধমকাতে দেখা যায়।

-আঃ কিচ্ছুটি বলতে হইবেক লা। আমি আছিত।

কথাটা যেন এমন শুনালো চিন্তা করিস না রাতে তোর ভাতারের অভাব আমি পূর্ণ করে দেব।

বুক ফেটে গেলেও মিডিয়ার সামনে মুখ ফোটার উপায় নেই।মা, বোন, বউ, বেটি; মা মাটি মানুষের।যাদের শিশু সন্তান, বাবা, কাকা, ভাই, বোন পুড়ে হেজে মরেছে কিংবা খুন হয়েছে বাঁধের ধারে, মাঠে, ময়দানে।

কয়দিনের মধ্যে চব্বিশটা খুন নীরব প্রশাসন।টিভি চ্যানেলের ঠাণ্ডা হিম ঘরে বসে ঠাণ্ডা পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে পক্ষ বিপক্ষ গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে মাতিয়ে রাখে আসর! হিসেব কষে অঙ্ক করে দেখায় অশোক না আকবর কার সময় কার সাম্রাজ্যে কত মানুষ খুন হয়েছিল।

বীরভূমের বিটি লো সাধ কি তোর মিটিল!মৃতের স্বজনের আর্তনাদ;চোখের জলও বাইরে আসার উপায় নেই।মুখ গুলো সব চিনে রাখা হবে।

-খপরের কাগজের লোকের কাছে মুখ খুলেছ-তো তোমার খপর আছেক বটে।দু'লক্ষ টাকা তো দূর গ্রামে থাকতে পারবেক লা।

লাল মাটিতে মানুষের রক্তের ছাপ বোঝার উপায় লাই।গুটিকয় মাওবাদী নকশালপন্থী যারা ছিল সব লাল থেকে সবুজ হয়ে গেছে।

-কোন প্রাণীর রক্ত সবুজ হয় গো বাবু?

পুলিশের বড় কর্তা পোঁদে রুলের গুঁতো মেরে বলল;

-কেনরে শালা ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসবি নাকি।নিউ গিনি নামের এক প্রকার গিরগিটির রক্ত সবুজ হয় বুঝলি।

তাড়িখোর লোকটা টলতে টলতে বলল;

-তোদের পেশী ও জিহ্বাও সবুজ তাই লারে বাবু?

কাল কোটে চালান হবে। এত গুলো খুন পুলিশ তো বসে থাকতে পারে না। তাই তাড়িখানা থেকে কয়েকটা মাতাল তুলে আনা হয়েছে।কিছুত কাজ দেখাতেই হবে। পয়সা দিলে খুন ও কবুল করে নেবে।এমন নকল আসামীও ভাড়ায় পাওয়া যায়।

লাল মাটিতে মানুষের রক্তের দাগ লুকিয়ে ফেলা সহজ।

মালতী ও একটি প্রশ্ন রথীন্দ্রনাথ রায়

ছোট গল্প,
মালতী ও একটি প্রশ্ন 
রথীন্দ্রনাথ রায়

মালতীর হাসপাতাল থেকে বেরোতেই পাঁচটা । কাজ যেন আর শেষ হয়না । রেবাদিও আসতে দেরি করল তাই ওরও দেরি হল । বাস থেকে নেমে প্রায় চার কিমি পথ । ভাই অমলটা সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন আসে । আজও আসবে । ওর আব্দার ওকে একটা কম্পিউটার কিনে দিতে হবে । মালতী বলেছে দেবে । তবে শর্ত  মাধ্যমিকে ওকে এক থেকে দশের মধ্যে রেজাল্ট করতে হবে । 
অমল বলেছে, তুমি দেখে নিও  , আমি এক থেকে দশের মধ্যে থাকছি । 
খুব লড়াকু অমলটা । বইপত্র তেমন কিছু পায়নি । তবু রেজাল্ট করে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো । পরের মাসে দেখা যাক । 
বাস থেকে যখন নামল তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে । অমল সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েই ছিল ।বলল, দিদি তোর এত দেরি হল কেন রে  ? 
-- হসপিটালে স্টাফ কম ছিল তাই বেরোতে দেরি হল । 
--ওঠ । 
সাইকেলে ওঠে মালতী । আজ পরিবেশটা কেমন থমথমে । একটা মাত্র চায়ের দোকান খোলা রয়েছে । তার সামনে একটা লোক কাকে যেন ফোন করছে । লোকটাকে চেনে কিন্তু নামটা মনে করতে পারছেনা । 
বেশ জোরে সাইকেল চালাচ্ছে অমল । অন্ধকার হলেও মোটামুটি চারপাশটাকে দেখা যায় । দুপাশে নানারকমের গাছের সারি ।বেশ কিছুটা আসার পর একটু জঙ্গল মতো জায়গায় কাদের যেন গলার আওয়াজ পেল । কারা কিসব বলছে । ভয় পেল মালতী । আর একটু এগিয়ে আসতেই মুখের ওপর গামছা জড়ানো কয়েকজন তাদের সামনে এসে সাইকেলটাকে আটকাল । 
-- নাম বোকাচোদা । কে হয় রে তোর  ? 
-- দিদি । 
-- ভাগ শ্লা দিদি ভাতারি । 
লোকটা একটা থাপ্পড় মারে অমলকে । 
পাল্টা থাপ্পড় মারে অমলও । 
মালতী ওদেরকে বাধা দিতে চায় । বলে, কেন মারছ ওকে  ?
-- থাম মাগি । রেতের বেলায় নষ্টামি করবে আর মারবে না । ছেলেটার মুখটা বেঁধে দে । আর এ মালটাকে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে চল । 
কিন্তু তার আগেই পাশে পড়ে থাকা বেশ বড় একটা ইঁট নিয়ে অমল ওদের একজনের মুখে ছুঁড়ে মারল । 'বাবাগো ' বলে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা । আর একজনকে একটা লাথি মারতেই অপরজন রিভলভার বের করে গুলি করল । একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল অমল । 
 -- বাঁচাও । 
চিৎকারটা জঙ্গলের মধ্যে একটা প্রতিধ্বনি তুলে হারিয়ে গেল । কিন্তু মালতীকে বাঁচাতে রাস্তার পাশে সেই সুনসান জঙ্গলে কেউ এলোনা । নিজেকে বাঁচাতে ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে কাঁটা ঝোপের  মধ্যে পড়ে গেল মালতী । তারপর  ? 
না । আমি পারছিনা সেই দৃশ্যের বর্ণনা করতে । 
কিছুক্ষণ পরে সেই রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম আমি ও আমার এক বন্ধু । বাইকের আলোয় দেখে মনে হল কারা যেন জঙ্গলের ভেতর ছুটে পালাল । কিছু একটা হয়েছে মনে করে বাইক থামালাম । বন্ধু রাকেশ বলল, বাইক না থামালেই ভালো হতো । কার ঝামেলা কার ঘাড়ে পড়বে ? 
-- না রে, দেখি একবার । টর্চের আলোয় চারদিক খুঁজতে থাকলাম । একটা গোঙানির মতো শব্দ  । 'আমাকে বাঁচান ' -- ঝোপের আড়ালে  প্রায় বিবস্ত্র এক মহিলা । ওর নিম্নাঙ্গটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে । আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না আমার । রাকেশকে ডেকে বললাম, জলটা নিয়ে আয় । মেয়েটির মুখে মাথায় জল দিয়ে জানতে পারলাম ভাইয়ের সঙ্গে ফিরছিল ও । আমি অনেককে ফোন করলাম । সঙ্গে থানাকেও । খুঁজে পেলাম ওর ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ । আর একটু দূরে মুখ থেঁতলানো এক দুষ্কৃতী । সাংঘাতিক ভাবে আহত মালতী হাসপাতালে পুলিশকে জবানবন্দি দেওয়ার সময় বলল  , আমরা তো স্বাধীন দেশের নাগরিক । তাহলে সন্ধ্যে সাতটার সময় কেন আমি বাড়ি ফিরতে পারলাম না ?
তারপর অনেক চেষ্টা করেও ওকে বাঁচানো যায়নি । শুধু ওর প্রশ্নটাই থেকে গেছে ।  (শেষ  ) 
# কলমে রথীন্দ্রনাথ রায় 
গ্রাম + পোস্ট গীধগ্রাম 
পূর্ব বর্ধমান  সূচক  713143
মোবাইল নং  9064807207 wh

ভুতুড়ে পরকীয়া "-- প্রদীপ দে

ছোটগল্পঃ
    " ভুতুড়ে পরকীয়া "
              প্রদীপ দে ~


আমি মদন সামন্ত। একজন বেসরকারি কর্মচারী।রোজের মতোই আজ শনিবার , সকাল আটটায়, 
অফিস বেরিয়ে সামনের শনি মন্দিরে মাথা নেতিয়ে অটো ধরার জন্য এগোচ্ছি সামনেই দেখি হাবলাদা পাশের দোকানে চেল্লাচ্ছে,
-- একটা খুব মোটা আর শক্তপোক্ত দড়ি দাওতো? 

আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম ওনাকে দেখেই - একেবারে বাঘের মুখে! তাড়াতাড়ি অটো পেয়ে বেঁচে গেলাম। মুখ লুকিয়ে দেখলাম একটা ইয়া মোটা দড়ি টেনেটুনে দেখছে হাবলাদা। খুব বাঁচা বেঁচে গেছি বাব্বা!

আসলে হয়েছি কি -- হাবলাদা লোক ভালো, ওনার স্ত্রী আরো ভালো -- আহাঃ দেখতে কি! --একেবারে যাকে বলে রূপে লক্ষ্মী আর গুনে সরস্বতী! 
নামটাও কি মিষ্টি! --মৌ!

হাবলাদার বয়স একটু বেশিই - এই ধরুন পঞ্চাশ - ফঞ্চাশ হবে আর কি। মৌ 'র ওতো বয়সই নয় একেবারে কচি যুবতী -- এই ধরুন গিয়ে মেরেকুটে বাইশ কি তেইশ হবে! আর ব্যবহার কি সুন্দর! আমাকে খুব পছন্দ করে। আমিও। সকাল বেলা আজ আবার শনিবার মিথ্যা কথা বলবো না আমরা দুজন দুজনাকে ভালোবাসি। হাবলাদাকে লুকিয়ে অনেক ফষ্টিনষ্টি করি -সিনেমা যাই। আর যাবোই না বা কেন? প্রেম করা কি অন্যায়? তা হলে পরকীয়া আইনসিদ্ধ হলো কি ভাবে?

আমারও তো ঘরে বউ আছে। তাতে কি? এক সঙ্গী  কি সব সময় ভালো লাগে? বউ মানেই তো সেই একঘেয়েমি,  খিটখিটে আর ঝগড়ঝাটি!

আর পরের বউ কতো মিষ্টি লাগে -কত আদর করে। মৌ তো কতবারই আমায় বলেছে --এই বুড়োর লোহার খাঁচা থেকে আমায় বার করে তোমার মনের খাঁচায় বন্দী করো -আমি আর পারছি না গো!--দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যে!

যাক গে ওসব কথা থাক!- ভাবলে বুকের মধ্যেটা কেমন যেন চিনচিন করে ওঠে!-আর ভাবতে পারি না!

বাস, ট্রেন আর অটোয় করে রাত দশটায় অফিস ফেরত যখন পাড়ায় এসে নামলাম দেখি পথঘাট কেমন যেন লাগছে --কেমন আধা অন্ধকার -- কেমন সব ফাঁকা ফাঁকা। একটা থমথমে ভাব চারপাশে।

ন্যাপার মুদিখানা আধখানা খোলা। দুজন খরিদ্দার ছিল,  পিছনে দাঁড়ালাম, কিছু কেনার নামে যদি খবর পাওয়া যায়। একটা শুকনো পাউরুটির প্যাকেট তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম -- হ্যারে ন্যাপা ব্যাপারটা কি? সব কেমন যেন ফাঁকা লাগছে?

-- ওহঃ কাকু আপনি জানেন না?

-- নারে।

-- আহাঃ বড় দুঃখের -- হাবলা আজ নিজের বউকে দড়িতে ঝুলিয়ে নিজেও ঝুলেছে -- এইমাত্র বডিদুটো পুলিশ নিয়ে গেল,  পোস্টমর্টেমের জন্য।

আমি তাড়াতাড়ি পয়সা মিটিয়ে দিলাম। অস্ফূটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল -- কেনরে?

মাথা ঘুরছে তবুও কানে এল --পরকীয়া প্রেমের ফল!

এবার বুঝলাম সকালে হাবলাদার দড়ি কেনার কারণ!

পাশের অন্ধকার গলিতে গিয়ে একটু সময় নিলাম -- ভাবছি বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে কিনা? জানাজানি হয়ে যায়নিতো আমিই সেই খলনায়ক? আমার বউ তাহলে তো ----

হঠাৎই অন্ধকার গলির অদূরে দেখি মৌ আর হাবলা হাত ধরাধরি করে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। মৌ এর চোখেমুখে যেন আগুন জ্বলছে -- হাবলাদাকে  বলছে -- ওই যে হারামজাদা!
যে আমাদের সংসারটাকে নষ্ট করে দিল।

হাবলাদা তেড়ে আসছে হাতে সেই মোটা দড়ি -- মৌ তুমি ভেবো না, ওকেও শালা আজ ছাড়বোনা........
-------------------------------------------------------------------।

বিঃদ্রঃ - পরের দিন ভোরের আলো ফুটতেই পাড়ার সকলে দেখেছিল - একটা ডেডবডি -পাড়ারই অন্য একজনের ল্যাম্পপোষ্টে গলায় দড়ি সমেত ঝুলন্ত অবস্থায়। নীচে পড়ে আছে অফিসব্যাগ আর একটা পাউরুটির প্যাকেট,  সবাই চিনেছিল ওকে -- ওর নাম যে --মদন সামন্ত!
---------

***প্রদীপ কুমার দে
বিরাটী আবাসন
এল আই জি -৯
এম বি রোড
নিমতা
কোলকাতা -৭০০০৪৯
মোবাইল -৮০১৭২৬৭৬২৬

আশুতোষ দেবনাথের-- অদৃশ্য অন্ধকার


আশুতোষ দেবনাথের
 অদৃশ্য অন্ধকার

আজকাল কেন জানি সন্ধের একটু পরে, মায়াময় রাত্রির শুরুতে ঊর্মির ভিতরে এক অদ্ভূত ছটফটানি শুরু হয়ে যায়। কিছুতেই আর বই -খাতা নিয়ে বসতে ইচ্ছে করে না। যমুনাকূলে কদমতলীতে কালার বাঁশি শুনে রাধিকার মন যেমন উচাটন হয়ে উঠতো, ঠিক তেমনিই সন্ধের পর রাত্রির শুরুতে কেবলে  সুপারহিট নাচাগানার সিনেমা শুরু হলে বই -খাতা রেখে উঠে যেতে ইচ্ছে করে ঊর্মির।
কিন্তু পারে না। কারণ সজল অল্প বয়সের গৃহশিক্ষক হলেও খুবই কড়া প্রকৃতির। তবু সুযোগ পেলে  ষোলো পেরিয়ে সতেরোয় পড়া ঊর্মি ছ'সাত বছরের বড়ো সজলের সঙ্গে বেয়াদবি করতে একেবারে ই কসুর করে না। সালোয়ার কামিজ পরা । ফর্সা, উজ্জ্বল চেহারার ঊর্মি, তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে উচ্ছ্বল জলতরঙ্গর ঢেউ তুলে এঁকেবেঁকে এক হেমন্তের সন্ধেয়  জানতে চাইলো, 'পাড়ায় নাকি  হোলনাইট ফাংশান হবে? কলকাতা আর
বোম্বের নায়ক- নায়িকা আসবে?'
ঊর্মির এই শারীরিক ভাষায় আর হঠাৎ এইসব খাপছাড়া প্রশ্ন করায় সজল ভিতরে ভিতরে রেগে যায়। রেগে গিয়েও কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না ঊর্মিকে। যদিও এখন আর ঊর্মিকে   ধোঁয়াওঠা কমজোরী হারিকেনের আলোয় পড়াতে হয় না। টিউব লাইটের উজ্জ্বল আলোয় আর সিলিং ফ্যানের মনোরম  হাওয়ায় চেয়ারে বসে পড়ায় ঊর্মিকে। তবু কেন জানি সজলের ভিতরে একটা অসহিষ্ণুতা ও বিরক্ত বোধ থেকেই যায়। কেন জানি সজলের মনে হয় এর থেকে  ভাঙাচোরা হারিকেনের ধোঁয়াওঠা আলো- আঁধারি আর ভ্যাপসা গুমোটের ঘেরাটোপ ভালো ছিল।
এখন এই আলোর রোশনাইতে ঊর্মির পড়তে বসার  ভঙ্গিমাটাই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ঊর্মির সাজসজ্জা, পোশাক আর আদব - কায়দায় এমনকি শারীরিক ভাষা ও চোখের দৃষ্টিতে ও এমন কিছু অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে যা সজলের  একেবারেই ভালো লাগে না। কেন জানি সজলের মনে সে যেন এক দুর্ভেদ্য রহস্যর
 অদৃশ্য অন্ধকার ঘেরাটোপে হারিয়ে যাচ্ছে। বৈদ্যুকরণের পর এখন প্রতি ঘরেই টেলিভিশন। তার সঙ্গে কেবলের প্রবেশ। সারারাত ধরে নাচা গানার সিনেমার  ভিডিও চালিয়ে খানাপিনা হয়। এসবের মায়ামোহে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে সাবান, শ্যাম্পু, স্নো- ক্রিম- পাউডার থেকে গর্ভনিরোধক পিলের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত। বাদ যাচ্ছে না 
কোনো কিছুই। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বোকা বাক্সের থেকে তরুণ - তরুণের একান্ত মনের মণিকোঠায় পৌঁছে যাচ্ছে একান্ত সংগোপনে। এইতো এখন ঊর্মির পরনে বাহারি সালোয়ার কামিজ। হাত - পায়ের নখে দামী নেইল পলিশ। চুলে শ্যাম্পু। চারদিকে অসংখ্য বিউটি পার্লার, টেলিফোনবুথ, ফুডপার্ক। বিগবাজার, আয়োনেক্স, সাবান, শ্যামপুর বিজ্ঞাপনে লাস্যময়ী মায়াবী হাতছানিতে বারবার পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া। লেখাপড়ায় মনোযোগ দেবার জন্য বারবার বকাঝকা করেও  ঊর্মিকে শোধরাতে পারে না সজল।
বললে, ঊর্মিও আজকাল তর্ক করতে ছাড়ে না। বলে, 'সবাই তো যাচ্ছে।সিনেমায়, বিউটিপার্লারে, শপিংমলে। দল বেঁধে হোলনাইট ফাংশানও দেখছে। আর কিনা আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম...আপনি বুঝি জানেন না? আপনার বন্ধুরাই তো করছে।'
'আমার বন্ধুরা!'
এবার যেন সজল নিজের কাছে নিজেই ধরা পড়ে যায়।
'হ্যাঁ। আপনার বন্ধুরাই তো। শ্যামলদা, কাজলদা, প্রবীরদা এরাই নাকি করছে? সবাই জানে আর আপনি জানেন না।' বলতে বলতে ঊর্মি যেন একটু অভিমানে মুখ ভার করে থাকে।
 ঊর্মি এতসব জানে। আর সেকি না... নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয় সজলের। সেতো জানে, সেদিন বর্ধিত নাগরিক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এত নিম্নবিত্ত ঘন বসতিতে জোর, জবরদস্তিপূর্বক চাঁদা তুলে সারা রাতব্যাপী জোরে মাইক বাজিয়ে  ফাংশান করা যাবে না। নাগরিক কমিটি যখন অনুমোদন দেয়নি তা হলে ফাংশান কী করে হতে পারে? যেখানে সারারাত ব্যাপী জোরে মাইক বাজানোর উপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? সেখানে কী করে সারারাত ধরে জলশার অনুমোদন পেতে পারে সেটা কিছুতেই সজলের বোধগম্য হয় না। যেন সে এক গোলকধাঁধার মধ্যে নিজেই থমকে যায়। সাধারণ মানুষের থেকে জোর করে চাঁদা তুলে অপসংস্কৃতির আয়োজনের বিরোধিতা তো এতদিন আমরাই করে এসেছি। আর এখন ক্ষমতায়নের পর আমরাই সেটা কি করে করতে পারি? সেই জিজ্ঞাসাটা সজলের ভিতরে ঘূণপোকা কুরে কুরে খেতে থাকে। সেদিনের সেই বর্ধিত নাগরিকসভার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল শ্যামল, কাজল, বদন, কালুরা। তাদের একটাই বক্তব্য ছিল যে চারিদিকে সবাই হৈমন্তীর শুক্লপক্ষে সারারাত ব্যাপী কলকাতা - মুম্বাইয়ের নায়ক - নায়িকাদের সমাবেশে জলশার আয়োজন হচ্ছে তখন আমাদের ছেলেরাও চাইছে সেটা করতে।  সেটাই নাকি এলাকার বেশিরভাগ ছেলেমেয়েদের ডিমান্ড। না হলে?
জয়ন্তীর মায়ের কাছে হয়তো সজল অন্য কারণে অপরাধী। ভীষণভাবে অপরাধী। জয়ন্তীর বাবা ছিলেন একজন দক্ষ বিড়ি শ্রমিক। সেরা কারিগর। বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে যে অসুখটা প্রায় বিড়ি কারিগরদের হয়ে থাকে, সেটাকে অনেকেই বলে রাজ রোগ। মানে যক্ষ্মা। মানে টিবি। রোগে দীর্ঘদিন ভুগে  ভুগে পরিবারটিকে সর্বস্বান্ত করে শহীদ হবার পর জয়ন্তী কালীমাসীর সঙ্গে কলকাতা না মুম্বাই কোথায় যেন নাচতে যাবার বাহানায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে । গেছে তো গেছেই। বিগত এক বছরে আজ পর্যন্ত সে ফিরে আসেনি। কোনো টাকাও পাঠায়নি।  জয়ন্তীর মা প্রায়দিনই সন্ধের পর রাত্রির শুরুতে অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে সজলের কাছে এসে কান্নাকাটি করে জয়ন্তীর খোঁজ জানার জন্য।  এইরকম আরো অনেক জয়ন্তীই নাকি আছে খালপাড়ের ওদিকে। যারা এরকম বাইরে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। আর ফিরে আসেনি।
ঊর্মি তার ভিতরের অভিমান ভিতরেই প্রতিরোধ করে জানতে চাইল, ' সত্যি আপনি জানেন না ?'
সজল ঊর্মিকে কী  বলবে ভেবে পায় না। ঊর্মি যখন তাঁকে বিশ্বাস করতে চাইছে না তখন...!
 ঊর্মিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে  হাঁটতে হাঁটতে সজলের মনে হলো সে নিজেই যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ।

হেলদোলনা হোলিদোল?--সীমাব্যানার্জ্জী-রায়

হেলদোলনা হোলিদোল?
সীমাব্যানার্জ্জী-রায়

আজরামধনু রঙের আকাশ। যেতে হবেফ্রিস্কো,টেক্সাসএর উইন্ডসঙ ড্রাইভে ববির বাড়ি।বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ মাইল। আমার মত কুঁড়ের নড়ে বসা তো-বেশ রেফারি হারা খেলা।দোলপূর্ণিমার নারায়ণ পুজো। নারায়ন পুজোয় না করতে নেই।ড্রেস কোডঃ মেয়েদের গোলাপী।ছেলেদের,আর বাচ্চাদের?ওরেবাব্বা:! যা খাপ্পা সব মেজাজ। হলুদ অথবা সাদা পাঞ্জাবী।ঠাকুরেরজন্য ফল মিষ্টি নিয়ে গাড়ির স্টীয়ারিং এ হাত রাখলাম। চুয়াল্লিশ মিনিটের পথ। যাচ্ছি তো যাচ্ছি-শোঁশোঁ গাড়িদের সাথে পাল্লা দিয়েআমিও শোঁ শোঁ। ওমাঃনিজেকে নিজেই বললাম-বাঃবেশ চালাচ্ছি তো আমি। চালাইএত দূর-কিন্তুকরোনা কালের পর এই প্রথম এতদূর গাড়ি চালালাম। শুরুকরে দিলাম,“ আমিযা করছি সবই তোমার কাজ/তোমায়মাগো বলতে নেই লাজ।” আহা!কিমসৃণভাবে গাড়ি চলেছে। হেলদোলকরতে করতে করতে হোলিদোল-এযাচ্ছি।পৌঁছেগেলাম নির্দ্দিষ্ট সময়েরএকটু পরে-তাহোক গে-পৌঁছেতো গেছি। প্রবেশপথে মা লক্ষ্মীর চালের গুঁড়োর চরণের মাঝখানদিয়ে এইবার বাড়ির ভিতরে গেলাম।নিখূঁতপুজোর আয়োজন করেছে ববি। রোদেরআলো জানলা বেয়ে আলিঙ্গন করছে ব্যক্তিকে নয়,ব্যক্তিসমষ্টি-কে...পুজোশেষে বাঙালির বিখ্যাত নিরামিষভুরিভোজ। পরিতৃপ্ত হলে শুরুহল আবীর বৃষ্টি। গত দুবছরেরদুঃখের সন্ধান ছুটে গেল আনন্দের সন্ধানে। রাঙাহাসির দোলহোলিপরিদৃশ্যমান । তখন জানলায়উঁকি মারে-হেলদোলেবিদেশের ছায়া।

অন্য রং-- নারায়ণ রায়।

অন্য রং 
নারায়ণ রায়।

রবিবার গুলোতে অমলকে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়, নাতনিকে নাচের স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। আজ হোলির ছুটি তাই নাতনিকে নিয়ে বেরনোর ব্যস্ততা নেই। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই অমল দেখতে পান আবাসনের বাচ্ছা ছেলে মেয়েরা হোলি খেলার আনন্দে মেতে উঠেছে, নাতনি ঝিলিকও কি সুন্দর বন্ধুদের সঙ্গে রং মেখে রঙীন হয়ে উঠেছে।  ঝিলিকের মত বয়সে ঝিলিকের বাবা ছোট্ট সেন্টুও হোলির দিনে মনের আনন্দে এমন রঙীন হয়ে উঠতো।

এসব কথা মনে পড়তেই অমলের চোখদুটো  অদ্ভূত এক অনুভুতিতে চক চক করে উঠলো। সে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা এমনই এক হোলির দিনে সকালে সদ্য বিবাহিত অমল নিজের ঘরে রেকর্ড প্লেয়ার চালিয়ে মন দিয়ে একটার পর একটা হোলির গান শুনে যাচ্ছে, এমন সময় মিটি মিটি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো মিনতি। সদ্য স্নান সেরে ঘরোয়া ভঙ্গিমায় একটা তাঁতের শাড়ি পরা মিনতিকে সেদিন পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দরী বলে মনে হয়েছিল অমলের। হঠাৎ অমলকে অবাক করে দিয়ে তার পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পরে অমল কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুপায়ে আবীর দিয়ে ঢিপ করে প্রণাম করে দিল। 

অমল তাড়াতাড়ি মিনতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, দূর বোকা মেয়ে, তোমার স্থান বুঝি আমার পায়ে? এই বলে অমল তার ঠোঁটদুটি মিনতির ঠোটের উপর ছোঁয়ানোর আগেই মিনতি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলো, ইস্ কি আহ্লাদ! কেউ দেখে ফেলুক আর আমি লজ্জায় মরি আর কি! আচ্ছা পরে আসবো'খন, না হলে তো আবার বাবুর রাগ হবে ষোল আনা। এখন যাই মাকে লুচি বেলতে সাহায্য করতে হবে।

রান্না ঘর থেকে বৌমার লুচি ভাজার গন্ধ বেরোচ্ছে। সেন্টু তার ঘরে ল্যাপটপে কি যেন কাজ করছে। রবিবার বাড়ির সবার সঙ্গে বসে অমলেরও লুচি আর কালো জিরে দিয়ে সাদা সাদা করে আলুর চচ্চড়ি এবং শেষ পাতে দুপিস কালাকাঁদ সন্দেশ খেতে খুব ইচ্ছে করে। অমলের আলু এবং ঘিয়ে ভাজা জিনিস খাওয়া বারণ, আর মিষ্টি তো একেবারেই নিষেধ। একটু পরে বৌমা শুকনো মুড়ি আর শশা দিয়ে গেল...। এখন দাঁত টাও বেইমানি করছে শশা চিবতে আসুবিধা হয়। 

আজ সকালে বাজার যাওয়া সম্ভব নয় তাই ছেলে গতকাল রাত্রে অফিস থেকে ফেরার পথে, হাজীর মাংসের দোকানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে খাসির মাংস কিনে এনেছে। অমল তার নিজের ঘর থেকেই শুনতে পেল মাংসটা বৌমার হাতে দেওয়ার সময়ে ফিস ফিস করে ছেলে বলল, এই নাও Signature আনলাম বারোশো টাকা করে দাম নিল। ফ্রিজে রেখে দাও। কাল বিকেলের পার্টিতে আমার বস্ নিজে আসবে বলেছে তাই এই হলদিরামের স্নাক্সগুলোও নিয়ে এলাম। সামনে আমার প্রমোশন ডিউ, ওনার কনফিডেনশিয়াল রিপোর্টের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

মনে পড়ে  সেই সব দিনের কথা সেসব দিনও ছিল এমনই হোলির দুপুর। মিনতি খাসির মাংসটা রাঁধতো ভারী সুন্দর। রবিবার দুপুর বা এমন হোলির দিন মানেই কাগজি লেবু দিয়ে পাঁঠার ঝোল আর পুদিনার চাটনী। ছোট্ট সেন্টুটাও বাপের মত। খাসির মাংস খেতে বড্ড ভালবাসে। অমল নিজের বাটি থেকে নরম দেখে মাংস আর মেটে গুলো সস্নেহে ছেলের পাতে তুলে দেয়, সেন্টু আরও বলত, বাবা পাইপ খাবো। অমল পরিষ্কার দেখে লম্বা হাড়টা সেন্টুকে দিতেই সে সুরুৎ করে চুষে ভিতরের শাঁসটা খেয়ে নিত, এই হ'ল পাইপ খাওয়া। 

অবশ্য বেশ কিছুদিন হ'ল ডাক্তারবাবু অমলকে খাসির মাংস খেতে বারন করেছেন। ছেলের অবশ্য সেসব দিকে ভীষন নজর, নিজেদের জন্য খাসির মাংসের সঙ্গে বাবার জন্যও চারা পোনা নিয়ে এসেছে। ...বৌমার আবার নজর ততোধিক...। তার শশুরের জন্য পেঁপে দিয়ে পাতলা করে চারা পোনার ঝোল করে দেবে। 

তবে  অমলের পৈত্রিক বাড়িতে অবশ্য হোলির দিনে গোপীনাথ জিউ এর পূজো হ'ত এবং সারাদিন নিরামিষ খাওয়া দাওয়া। মা সকালেই চান করে তাঁতের শাড়ি পরে পুজোর জোগাড়ে বসে যেত আর সঙ্গে হেল্পিং হ্যান্ড মিনতি। মা গাওয়া ঘি এর লুচি ভাজতেন আর সঙ্গে মোহনভোগ। মায়ের হাতের তৈরী এমন  সুস্বাদু মোহনভোগ অমল জীবনে আর কোথাও খায়নি। খুব সুন্দর করে সুজিকে গাওয়া ঘিয়ে ভেজে কাজু কিসমিস দিয়ে অসাধারণ ঝুর ঝুরে সুস্বাদু এক মোহনভোগ তৈরী করতো মা।

সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির উঠোনে কীর্তনের আসর বসত। হারমোনিয়াম, খোল করতাল সহযোগে কীর্তন শুরু হতেই সমগ্র বড়ির পরিবেশটাই যেন পালটে যেত! অমল অবাক হয়ে লক্ষ্য করত, বিধবারা যারা জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই সংসার, প্রেম, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত, তারাই সবচেয়ে বেশি নিবিষ্ট মনে কীর্তন শোনে। বিশেষ করে গানের মাঝে যখন গলায় রজনীগন্ধার মালা পরে কপালে চন্দন চর্চিত কথকঠাকুর কৃষ্ণলীলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন তখন অনেকেরই চোখে জলের ধারা কোন বাধা মানতো না। অমল অবাক হয়ে শুনতো সেই ব্যাখ্যা।

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন,
তুমি যেখানে, আমিও সেখানে,  আমাদিগের মধ্যে নিশ্চিত কোন ভেদ নাই। দুগ্ধে যেমন ধবলতা, অগ্নিতে যেমন দাহিকা, পৃথিবীতে যেমন গন্ধ, তেমনই আমি তোমাতে সর্বদাই আছি। কুম্ভকার বিনা মৃত্তিকায় ঘট করিতে পারে না, স্বর্ণকার স্বর্ণ বিনা কুণ্ডল গড়িতে পারে না, তেমনই আমিও তোমা ব্যতীত সৃষ্টি করিতে পারি না। তুমি সৃষ্টির আধারভূতা, আমি অচ্যুতবীজরূপী। আমি যখন তোমা ব্যতীত থাকি, তখন লোকে আমাকে ‘কৃষ্ণ’ বলে, তোমার সহিত থাকিলে শ্রীকৃষ্ণ বলে। তুমি শ্রী, তুমি সম্পত্তি, তুমি আধারস্বরূপিণী, সকলের এবং আমার সর্বশক্তিস্বরূপা। 

অমল লক্ষ্য ক'রত এই ব্যাখ্যা শোনা মাত্র ওর বাল্য বিধবা পিসি যার স্বামীর মুখখানাই আজ আর মনে পড়েনা সেই পিসিও অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে।

বিকেলে অমল এক কাপ চিনি ছাড়া লিকার চা খেয়ে পাড়ার শীতলা মাতার মন্দিরে কীর্তন শুনতে যাবে। তবে ৭টা নাগাদ বৌমা গিয়ে নিয়ে আসবে... আজকাল সন্ধ্যার পর রাস্তা পার হতে ভয় হয়। বাড়িতে এসে অন্ধকার ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতে হয়, টি ভি দেখতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই...চোখ দুটো আজকাল বেশ জ্বালাতন করছে। পাশের ঘরে বৌমা ঝিলিককে গান শেখাচ্ছে। বৌমার গানের গলাটি ভারি মিষ্টি। ঝিলিকও বেশ গাইছে ভাল। তবে কেন জানিনা আজ ওরা কোন হোলির গান গাইছে না। ওরা গাইছে:-

""মধুর, তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ-
ভুবন জুড়ে রইল লেগে আনন্দ-আবেশ।
দিনান্তের এই এক কোনাতে সন্ধ্যামেঘের শেষ সোনাতে
মন যে আমার গুঞ্জরিছে কোথায় নিরুদ্দেশ।""

আজ সাতটা বাজার একটু আগেই বৌমা গিয়ে অমলকে কীর্তনের আসর থেকে নিয়ে এসেছে।
ঝিলিক অমলের গায়ের উপর পাদদুটো তুলে দিয়ে দাদুর পাশে শুয়ে আছে। ওকে উপেন্দ্রকিশোরের 'ভালা বুড়া'র গল্পটা বলতে হবে।

ড্রইং রুমে ছেলের ক'জন বন্ধু এসেছেন, ওদের ঘরের দরজা বন্ধ। ওরা নিশ্চই বর্তমান বাজার দর আর রাজনীতি  আর আগামী ভোট নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। বৌমা মাঝে মাঝে ওদের ঘরে খাবার দাবার দিয়ে আসছে।  মাঝে মাঝে দরজা ফাঁক হতেই কাঁচের গ্লাসের ঠুং ঠাং শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ঘরের হালকা আলোয় অমলের চোখ গিয়ে পড়লো দেয়ালে টাঙ্গানো মিনতির বাঁধানো ফটোটার দিকে।  ওদের যখন বিয়ে হয়, তখন মিনতি মাত্র ষোল আর অমলের ছিল চব্বিশ। কি বোকা আর ভীতু ছিল মেয়েটা। কোনদিন ঘরে একা কিছুতেই শুতে পারতো না। অথচ  মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে একা একা এক ঘোরতর অন্ধকারের রাস্তা ধরে কোথায় যেন চলে গেল মিনতি! সত্যিই সুন্দরী ছিল মিনতি। ফটোতে মানুষের বয়স বাড়ে না.....কি সুন্দর হাসিমুখে তাকিয়ে আছে অমলের দিকে। ভাবখানা এমন যেন--- "কি গো কেমন জব্দ ?" অমল জবাব দেয়, "গিন্নি, তুমি ভেবেছিলে আমাকে আচ্ছা জব্দ করবে, আমি বিপদে পড়বো? কিন্তু তুমি হেরে গেছো, এই দেখ আমি কেমন বিন্দাস আছি।" আর এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো ভিজে এলো।

পড়শী-- বহ্নিশিখা

পড়শী 
বহ্নি শিখা

ফুরুৎ ফুরুৎ চা খেতে খেতে আবীর বলল,চা-টা খুব স্বাদ অইছে।
তাকিয়ে আছে সোমা। শব্দের গভীরের শব্দ অনুরণিত হচ্ছে তার মনের কোথাও। বিপুল মোবাইলে কি যেনো দেখছে। দু'জনেই পাশের সোফায় বসা।
****
সোমা আর বিপুলের সংসারে আবিরের অবাধ যাতায়াত। দুজনই চাকুরীজীবি। 
এক সময় বিপুল আবীরকে আবিষ্কার করে। কাজের খোঁজে মফস্বল শহরে আসে আবীর। কোথাও কাজ না পেয়ে চুপচাপ বসে থাকে,চা দোকানের বেঞ্চে।  
বিপুলের অফিস ছুটির পর এখানে চা খেতে আসে। দু'দিন আবীরকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বিপুলের কৌতুহল হলো। বলল,
আপনাকে এখানে নতুন দেখছি। দুদিন যাবৎ। চুপচাপ বসে থাকেন,আসেন,চা খাই। কোথায় বাড়ি? কি নাম? এখানে কেন আসা?
সবকিছু জেনে তাকে নিয়ে এলো বাসায়।  বলল,আমি আমার বাড়ির কাজ ধরবো। একজন বিশ্বস্ত লোক দরকার।  আপনি যদি করেন, করতে পারেন।
তারপর দীর্ঘদিন কেয়ারটেকারের কাজ করেছে আবীর । আস্তে আস্তে সে ভরসার পাত্র হয়ে যায়। সোমা আবীরকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে কথা বলে। 
আবীরের প্রতি তার সংসারের প্রতি বিপুল সোমা দুজনই খুব সহানুভূতিশীল। এটা খুব ভালো লাগে আবীরের। 
বউ আর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ছ'জনের সংসার,খুব কষ্ট হয়ে যেতো চলতে। কাজটা পেয়ে হালে পানি পেলো। 
বিপুল সোমার সংসারের পুরোনো অনেক জিনিসপত্র, কাপড়চোপড় দিয়েই আবীরের ফ্যামিলির অনেক চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন হয়,ছেলে মেয়ে বড় হয়। কেয়ার টেকারের কাজ ছেড়ে দেয়। এভাবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে যায়।
বিপুল সোমা রিটায়ার্ড হয়। কিন্তু আবীর, বিপুল সোমার মন বদলায় না। সেদিন বিপুলই ওকে আসতে বলেছিল। সোমা দু'পদের মাছ,ডাল,মাংস রেধে খাইয়েছে।
বিকেলে চা পর্বে তিনজনই বসে আছে। সামনে চায়ের সরঞ্জাম। সোমা রং চা ঢেলে চিনি দিয়ে নাড়ছে দুজনেই তাকিয়ে আছে সোমার হাত আর চায়ের কাপের দিকে। হঠাৎ আবীর বলল,
ফিইরা আইছে পাগলি। সোমা বলল,পাগলি কে? কার কথা বলছেন?
--আর কেডা। আপনের পড়শী। 
ওহ, আচ্ছা! গেছিলো কোথায়? 
-- ঢাকা।
কেন?
--আর কেন,কোন ধান্দায় মন চাইছে চইলা গেছে । সে আবার বাসে উঠে না,ট্রেনে গেছে, ছেড়া একটা শাড়ি পরনে। মাথায় চুল তো নাই-ই,যা আছে  আউলাঝাউলা। সাথে কোন ব্যাগ ট্যাগ নাই,মোবাইলটা আবার আছে। 
বিপুল বলল,আপনি করে জানলেন বা দেখলেন?
--আমি তখন বাজারে যাই,সকাল এগারোটা বাজে। আমার বাড়ির সামনের বড় রাস্তায় কয়েকজন লোক জড় হইয়া কথা বলতেছে। আমি আগাইয়া দেখতে গেলাম ব্যাপারটা কি। দেখলাম,রিহ্যাবের লোকের সাথে জেরা করতেছে।
তখনই ফোন দিলো,পাগলির জামাই। বলল,আবীরভাই আমি আপনার বাসার খুব কাছে দাঁড়িয়ে।
সামনে আসতে পারছি না,আমাকে দেখলেই পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে। আপনি একটু বুঝিয়ে কিছু খাইয়ে দেন,রিহ্যাবের ওরা আপনার পাশে থাকবে।
তারপর? সোমা বলল।
-- তারপর আর কি? আটকে গেলাম। বাজারে না গিয়া তারে বাড়িতে এনে গিন্নীরে বলে খাওয়া দাওয়া করাইলাম। শুইলো।
আমি ভাবতেও অবাক হইয়া যাই সে কি ভাবে চাকরি করলো এতোদিন।
বিপুল বলল,আসলে কাজ তো সে করে নাই,কাজ করে দিছে অন্য স্টাফেরা।কেউ যদি না বলেছে তার চৌদ্দগোষ্টির সবাইরে ন্যাংটো করে ফেলছে অফিসেই। ভয়ে যে যা পারছে করে দিছে। তার তো উঁচু লেভেলে খুব যাতায়াত ছিল।
হ্যাঁ, আপনের বাসায় থাকাকালীন তার সাথে পরিচয়,কথা, কাজও করে দিছি অনেক। যাইহোক। 
শতচেষ্টা করেও তাকে অ্যাসাইলামে আনা গেলো না। ঘর থেকে নড়ছেই না। বলে, আমি আর কোথাও যাবো না আবীর। আমি তোমার কাছেই থাকবো। 
আমাকে তাড়াবার চেষ্টা করো না,চিল্লাবো।

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল  রূপো বর্মন  একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যা...