Wednesday, 6 April 2022

ইচ্ছের দাম-- অরুণ চট্টোপাধ্যায়

ইচ্ছের দাম
অরুণ চট্টোপাধ্যায়

-অটো!

ঘ্যাঁচ করে কয়েক ফুট দূরে থেমে গেল অটোটা। চালক মুখ বাড়িয়ে পেছনে তাকাল।

দু’জন দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে অটোর দিকে। এদিকে আলো তেমন বেশি নেই। দুটো ল্যাম্প পোস্টের মাঝের একটা জায়গা। দুজনে হাঁপাহাঁপি করে উঠে বসল অটোতে। ভেতরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। দুজনে ব্যাগপত্তর একটু গুছিয়ে নিয়ে বসল। যুবক আর যুবতী দুজনের মুখেই যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যাওয়া আনন্দের হাসি।

-এত রাতে অটো পাব ভাবতে পারি নি। সোনালি গুছিয়ে বসেছ তো?

-হ্যাঁ গো হ্যাঁ। ওঃ বাবা দিব্যেন্দুর জন্যে এত দেরিটা হয়ে গেল। আবার বলছিল নাকি আজ রাতটা থাকতে। না বাবা এমনিতেই শরীর যা ক্লান্ত। সুব্রত তুমি পানটা নিয়েছ তো?

-তা আর নোব না? আমার সোনালি সুন্দরী পান খেতে কত ভালবাসে তা কি আমি জানি না?

-তাই তো বলছিল দিব্যেন্দুর বৌ। বলল কত্তাটি তোমাকে যা ভালবাসে দেখবে ঠিক পানের মোড়া তোমার জন্যে নিয়ে যাবে। আর-

সুব্রতর মুখেও খুশির হাসি, আর কি শুনি?

সোনালির মুখে হাসি আর ধরে না। ফিসফিস করে বলল তোমার কত্তা পান খাইয়ে তোমার লাল ঠোঁট কখন দেখবে সেই জন্যে একেবারে ছটফট করছে।

খিল খিল করে হাসল সোনালি। সুব্রতর মুখেও রাঙ্গা হাসি।

-আরে তুমি কেন হাঁ করে আমাদের কথা শুনছ? অটোটা একটু জোরে চালাও না। আমাদের ফিরতে তো এমনিই রাত হয়ে গেছে।

ড্রাইভার এতক্ষণ ধরে বাইরের আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়নায় সোনালির সুন্দর মুখের প্রতিবিম্ব। ব্যাগ খুলে পান বার করে দিয়েছে সুব্রত। চিবিয়ে চিবিয়ে ঠোঁট লাল করে ফেলেছে। তার কস বেয়ে লালের একটা সরু ধারা আর চালকের জিভ সরস হয়ে উঠেছে।

-কোথায় নামবেন?

সুব্রত বলল, চিকুরের মোড় পেরিয়ে একটা স্টপেজ।

-চিকুরের মোড় যাবে না। ওদিকে রাস্তা খারাপ আছে।

ভ্রূ কোঁচকাল সোনালি আর সুব্রত দুজনেরই। সুব্রতর বিরক্তিতে আর সোনালির ভয়ে।

তারা দুজনে দুজনের দিকে চাইল।

-তবে?

-এই রাতে আর হেঁটে যেতে পারব না ভাই। একটু বেশি পয়সা দিতে হয় তো দেব। সোনালি বলল।

-বেশি পয়সা দিতে হবে না। একটু বেশি হাঁটুন। চিকুর মোড়ের আগে রাস্তা খুঁড়েছে। সব গাড়ি চম্পাহাটি মোড় দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে।

-বললেই হল চম্পাহাটি মোড়? সোনালি রেগে উঠল, এই তো সকালে আমার এক বান্ধবী কলেজ থেকে গাড়ি নিয়ে ফিরল। আমাদের কি বোকা পেয়েছ।

-আঃ সোনা কি হচ্ছে? ও যখন বলছে তখন কথাটা তো আর মিথ্যে হতে পারে না? ঠিক আছে ভাই তাই চল।

ভয়ে সোনালির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। কিছুটা ফিসফিস করে বলল, এখন রাত কত হয়েছে জান? মোবাইল বার করে সুব্রত বলল, রাত একটা পঁয়ত্রিশ।

-তবে? রাস্তাটা একেবারে শুনসান। গাড়িও তেমন চলে না।

-আজ চলছে। তাদের কথার মধ্যেই কথা বলল চালক, আজ তো মেন রাস্তাটা খোঁড়া। তাই সব ঘুরে যাচ্ছে।

বলতে বলতেই এসে পড়ল মোড়টা। সোজা রাস্তাটা চলে গেছে চিকুর মোড়ের দিকে। আর বাঁয়ের এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় ধড়াস করে ঢুকে পড়ল অটোটা।

তাদের পেছনে একটা গাড়ি আসছিল। সেটা কিন্তু সোজা বেরিয়ে গেল বড় রাস্তা ধরেই। সোনালি আবার চেঁচিয়ে উঠল, আরে ওই তো ওই গাড়িটা চলে গেল।

-ওটা চিকুর মোড় পর্যন্ত যাবে না। চালকের গম্ভীর স্বর।

--তুমি কি করে জানলে? বাজে কথা বলছ। আবার তর্ক তুলল সোনালি।

তাকে শান্ত করতে সুব্রত বলল, আহা কেন বাজে তর্ক করছ সোনা? ও তো ড্রাইভার নাকি? আমাদের থেকে কম জানলে ওদের চলে বল? চল ভাই তুমি চল। ঘুরে গেলে নাহয় পাঁচ দশ মিনিট দেরি হবে এই বই তো নয়? কত আর বাজবে? দুটোর মধ্যেই ঠিক পৌঁছে যাব কি বল?

চালক কথা না বলে গাড়ি চালাতে লাগল। একটা প্রায় পান্ডব বর্জিত জায়গা। সেই আধা অন্ধকারে যেন শ্মশানের মত লাগছে। কিন্তু বেশ কিছুটা দ্রুত গতিতে এসে অটোটা থেমে গেল।

সোনালি ভয়ে ভয়ে তাকাল সুব্রতর দিকে। সুব্রত কড়া স্বরে বলল, কি হল আবার?

চুপ করে দশ কুড়ি সেকেন্ড বসে থেকে উঠে পড়ল চালক। নামল অটো থেকে আর হাত দিয়ে ধরে অটোটাকে রাস্তার অনেক বাঁয়ে নিয়ে এল। তারপর দ্রুত চলে এল পেছনের সিটের দিকে। সোনালি ছিল ভেতরের দিকে। সুব্রত প্রশ্ন করল, কি ব্যাপার?

- স্পার্ক প্লাগ পাল্টাতে হবে মনে হয়। আপনি একটু উঠুন তো দাদা। যন্ত্রপাতি নিতে হবে।

তড়িঘড়ি উঠে পড়ল সুব্রত।

-আপনি বরং সামনের সিটে ততক্ষণ বসুন গিয়ে। আমার কাজ শেষ হলে আবার এসে বসবেন।

সুব্রত চলে যেতেই সোনালি নামতে যাচ্ছিল। চালক প্রায় ধমকে বলে উঠল, আপনাকে নামতে কি বলেছি ম্যাডাম? আপনি বসে থাকুন।

তার কড়া কথাটায় একটু অপমানিত বোধ করল সোনালি। চোখ তুলে তাকাল সুব্রতর দিকে। সুব্রত চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, কোনও ভয় নেই।

এই সময় পাশে আর একটা অটো এসে একেবারে তাদের অটোর গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

-হবে নাকি গুরু? সে জিজ্ঞেস করল।

-হচ্ছে তো। তাদের চালক বলল, একের পর এক। হড়বড় করবি না কেলো।  হড়বড় করে গাড়ি সারালে আবার মাঝরাস্তায় কোথায় বিগড়ে যাবে তার ঠিক নেই।

গাড়ি কতক্ষণে ঠিক হবে ভেবে শিউরে উঠল সোনালি।

-কেলো আমি ইঞ্জিন দেখছি। তুই ক্লাচটা সামলা।

বলে অটোর ওপরে উঠে পড়ল চালক। সোনালিকে বলল, আপনি পা তুলুন তো ম্যাডাম। দুটো পা। নিচে প্লাগটা গড়িয়ে পড়ল। খুঁজতে হবে।

কিন্তু দুটো পা তুলে রাখবে কোথায়? সোনালি বেশ বিরক্ত। চালক প্রায় ধমকে বলে সিটে শুয়ে পড়ুন না। আমাকে নিচে খুঁজতে হবে।

সোনালি ইতস্তত করছে দেখে সে জোর করে সোনালিকে শুইয়ে দিল সিটে। সোনালি আপত্তি করতেই চালক আবার ধমকে বলল, চুপ করুন। আপনার বাজে কথা শোনার জন্যে এত রাত্তিরে কেউ নেই।

সুব্রতর পিঠে হঠাৎ একটা ধাতব অনুভূতি। 

-চুপ করে নিজের সিটে বসে থাকুন স্যার। এটা দিশি তাই বিশ্বাস নেই। পায়ের জায়গায় বুকে বা মাথায় লাগলে আমাকে দোষ দেবেন না কিন্তু।

খোঁচাটা কিসের তা বুঝে গেছে সুব্রত। চুপ করে উঠে বসল ড্রাইভারের পাশের সিটে।

এদিকে সোনালির সঙ্গে চলেছে চালকের ধস্তাধস্তি। কেলো সুব্রতর দিকে তার দিশি তাক করে রেখে নজর রাখছে রাস্তায়। চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ, একটা অটো আসছে গুরু।

-অটো! চঞ্চল হল চালক।

একটা নয় তিন তিনটে অটো এসে ঘিরে ধরল এই অটোটাকে। তিনটে চালক এগিয়ে আসার আগেই ততোক্ষণে আসল রিভলবার হাতে এসে গেছে পুলিশের মেজবাবু শশধর সামন্তের হাতে। তিন অটো চালক মানে দুই কনস্টেবল আর এক এ এস আই এগিয়ে এসে নেমে গেছে ফিল্ডে।

এ এস আই নিখিল এগিয়ে এসে বলল, ম্যাডাম আপনার কিছু হয় নি তো?

থানার ফার্স্ট অফিসার ম্যাডাম নীহার বসু হাসিমুখে উঠে বসে বললেন, হতে পারত। তোমাদের পাংচুয়ালিটি আমাদের ফোর্সের গর্ব।

সেকেন্ড অফিসার সুব্রত ওরফে মিঃ সামন্ত বললেন, অটোর মাথার বাঁ দিকের কোণে দেখ চিপসটা লাগানো আছে। ওটাই মেন ডকুমেন্ট। আদালতে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে।

ম্যাডাম উঠে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। একমাস ধরে চলা একটা কুনাট্যের এই রজনীতে অবসান। গভীর রাতে যাত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অটোকে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে মলেস্ট করা হচ্ছিল মেয়েগুলোকে। তাদের চোখে জল ধরিয়ে মজা লুঠছিল দুটো আপাত-নিরীহ অটো চালক।

No comments:

Post a Comment

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল  রূপো বর্মন  একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যা...