রূপো বর্মন
একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যাচ্ছে। দুজনের গায়ে নীল আর সাদা রঙের জামা পায়ে সাদা মজা এবং কালো বুট জুতো। পিঠে ঝোলানো সাদা রঙের ব্যাগ দুটি যেন শান্তির ঝোলা। চোখ ফেরানো যায় না নিষ্পাপ মনের নিষ্পাপ হাসি দেখে।
হঠাৎ একটা কথা শুনতে পেলাম "ইস, লোকটাকে মেরে ফেলল বুঝি"। কথাটি অবশ্য আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাস গাড়ির জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তি বলেছিলেন। কথাটি শোনামাত্র আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। তারপর দেখতে পেলাম সাত আট জনের মতো মানুষ একটি চলন্ত গাড়ির পেছন পেছন ছুটছে। গাড়িটিতে ওঠার জন্য। তাদের গায়ে ধাক্কা লেগে একজন মানুষ মাটিতে পড়ে গেছে আর সবাই ওই মানুষটির উপর ভর দিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটি নিজের জামা কাপড় ঝেড়ে উঠছে আর থলে থেকে পড়ে যাওয়া জিনিস গুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে থলেতে ঢোকাচ্ছে। তার মধ্যে কিছু কিছু জিনিস আমার চোখে পড়ল সেগুলো ছিলো প্লাস্টিকের বোতল, ছেড়া খবরের কাগজ, নষ্ট হয়ে যাওয়া আপেল, পঁচা কলা, ভাঙ্গা বিস্কুট আর পাউরুটির কয়েকটা টুকরো। আমি তো অবাক হয়ে গেছিলাম লোকটিকে এসব ব্যাগে ঢোকাতে দেখে। তারপরেই খেয়াল করলাম লোকটির জামা কাপড় গুলো খুব নোংরা এবং ছেড়া। রোগা পাতলা চেহারায় একমুখ দাড়ি, মাথায় বড়ো বড়ো চুল। কয়েকজন লোক বলে উঠল "পাগল বলে মানুষ আজকাল মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না, কি দিন এলো"। কথাটি শোনামাত্র আমার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে গেল যে, এতক্ষণ ধরে যাকে আমি দেখছি সে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ যাকে আমরা সহজ ভাষায় পাগল বলে থাকি।
পাগলটির ওই জিনিস গুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে থলেতে ঢোকানোর সময় স্কুলের পথে রওনা দেওয়া বাচ্চা দুটি সেখানে এসে হাজির হলো। পাগলটির থলের সব অপরিস্কার জিনিস বের করে দিল এবং তাদের দুজনের স্কুলের টিফিনের খাবার গুলো পাগলটিকে দিয়ে দিল। আর অনেকের জুতোর আঘাতে পাগলটির বাম হাতে একটু চামড়া উঠে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। তখন তারা তাদের রুমাল দুটি দিয়ে পাগলটির হাত বেঁধে দিল। তারপর দুজনে পাগলটির হাত ধরে আমার থেকে হাত দু-এক দূরে এনে বসাল। অবশ্য আমি একটি বিশ্রামাগারে দাঁড়িয়ে ছিলাম গাড়িতে ওঠার জন্য। তারপর তারা পাগলটিকে বলল "কাকু রাস্তা পার হওয়ার সময় ডান দিক বাম দিক দেখে পার হবেন। নোংরা খাবার খাবেন না, চুল দাড়ি নখ কাটবেন এবং প্রতিদিন স্নান করবেন, আর সবসময় জামা কাপড় পরিস্কার রাখবেন"। এই কথা গুলো বলে দুজনে পাগলটির পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল "কাকু আজ আমাদের পরীক্ষা আছে আমাদের আশীর্বাদ করুন যাতে আমরা ভালো করে পড়াশোনা করতে পারি আর মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি"। বাচ্চা দুটির কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রাস্তায় একটি রিকশাওলা বাচ্চা দুটি কে ডাকল এবং বাচ্চা দুটিও রিকশায় উঠে পড়ল। যখন রিকশাটি স্কুলের পথে রওনা দিল। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে ভাবতে লাগলাম, এটাই হয়তো পরিবার শিক্ষা আর স্কুল শিক্ষার ফল।
No comments:
Post a Comment