তপন তরফদার
আদিম যুগ থেকেই লাভ জেহাদের বিষয়টি মানুষের মনে গেঁথে গেছে। ভালোলাগা আর ভালোবাসা, এই নিয়ে সেই আদম ইভদের যুগ থেকেই আমরা ধন্দে আছি। ধন্দ আরও বাড়িয়ে তুলেছে আজকের আদালত।
মেয়ের বিরুদ্ধে বাবা, ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে বাবার বিরুদ্ধে মেয়ে। মেয়েই এখন কাঠগড়ায়। দর্শকদের চোখে-মুখে আহ্লাদের হাসি। যত বেশি কথা চালাচালি হবে তত বেশি কেচ্ছা শোনা যাবে।
খুব দরদি গলায় মেয়েটি বলতে শুরু করলো, ধর্মাবতার আমার কর্তব্য সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। আমি গীতা ছুঁয়ে শপথ নিয়েছি। মিথ্যাচার কে আমি ঘৃণা করি।
প্রথমেই আপনার কাছে বিনম্র প্রার্থনা,প্রতিটি ঘটনার সঠিক মূল্যায়ন চাই। লক-আপের মধ্যে রয়েছে যে যুবক তার সম্পর্কেই সাক্ষ্য দিতে হবে আমাকে। ভয়ঙ্কর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। আপনার রায়ের উপর নির্ভর করছে আমাদের জীবন।
মেয়েটি একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছে।শ্যামলা রঙা, দোহারা চেহারা। চোয়াল এবং চিবুক উঁচিয়ে আছে প্রতিস্পর্ধায়। হাতে প্লাস্টিকের শাঁখা-পলা। কপালে ও সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুর।
আমার নাম মাধুরী। আমি এক গরিব পূজারী ব্রাহ্মণের কন্যা। শুনেছি আমার জন্মে বাবা খুশি হননি। ব্যাজার হয়েছিলেন তাঁর পরিবারের লোকজনও। ওনাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল পুত্র সন্তান। কিন্তু হলাম কন্যা। আমার জন্মের পর বাড়িতে শাঁখ বাজেনি। পুত্রসন্তান উপহার দিতে না পারায় মাকেও বহু গঞ্জনা শুনতে হয়েছিল। আমাদের সমাজে এটিকেই স্বাভাবিকই বলা চলে।
ধর্মাবতার, এই মামলার সঙ্গে অভিযুক্ত করা হয়েছে যুবকের বৃদ্ধ মা বাবাকেও। যিনি ঠিক পল্লীগ্রামের মানুষের অবয়ব। পরনে আধময়লা লুঙ্গি,গায়ে জীর্ণ হাফহাতা শার্ট। আবার এজলাসে এই মুহূর্তে আমার বাবা, কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন সহ বাবার অনুগামীদের দেখতে পাচ্ছি। বাবা ডায়েরি করেছেন আমার স্বামী আব্দুল রেজ্জাক এবং ওর পরিবারের লোকজন আমাকে “কিডন্যাপ” করে আটকে রেখেছে। মহামান্য বিচারপতি এখানে পুলিশের অতি সক্রিয়তা লক্ষ করেছেন। বাবা অনেক উৎকোচ দিয়েছেন পুলিশকে। বাবার সামাজিক সমস্যা হয়েছে আমি মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে কলঙ্কিত করেছি আমার পরিবারকে। আমি কেন আব্দুলকে বিয়ে করেছি আপনার কাছে নিবেদন করবো।
তখন আমি ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। টিউশনি থেকে ফিরছি। সাইকেল পাংচার হয়ে যায় রাসমণি প্রাইমারি স্কুলের আগে। স্কুলের বারান্দায় কারা। কিছু বোঝার আগেই চারজন ঘিরে ধরে বলে সাইকেল সারিয়ে দেবে। আমাকেই টেনে অন্ধকারময় গাব গাছের তলায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের মুখ দেখে আমি চিনতে পারি ওরা এই গ্রামেরই বর্ধিষ্ণু পরিবারের বখাটে ছেলে। এখানে মদের আসর বসিয়েছে। আমি বিপদ বুঝতে পেরে চিৎকার করতে থাকি। আমার ভাগ্য ভালো। আব্দুল ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ও এগিয়ে আসে। ছেলেগুলো ওকে ঘিরে ধরে। বচসা শুরু হয়। আব্দুল দমবার পাত্র নয়। হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। আব্দুল বলে মাধুরী তুমি পালিয়ে যাও, এরা তোমার সর্বনাশ করবেই। একজন শক্ত একটা গাছের ডাল দিয়ে সজোরে ওর মাথায় মারে। আব্দুল মাটিতে পড়ে যায়। ওরা চারজন মিলে বেধড়ক মারতে থাকে। আমি দৌড়ে বাড়িতে এসে বাবাকে সব বলি। বাবা বলেন, চুপচাপ থাকবি। কথাটা ভুলে ও মনে আনবি না বদনাম হয়ে যাবে। সবাই রসিয়ে রসিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেবে। আমরা মুখ দেখাতে পারবোনা।
পরের দিন গ্রামের আলোচনার বিষয় আব্দুল কোনও এক মেয়েকে ফুসলে এনেছিল ফূর্তি করতে। ধরা পরে যায়। মেয়ের বাড়ির লোকেরা ওকে মেরে মেয়েকে উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। কোন মেয়ে, কারা মেরেছে খোঁজ করেনা আমাদের হিন্দু গ্রামের লোকজন। সবাই খুশি একটা মুসলমানকে মেরে উচিতৎ শিক্ষা দিয়েছে।
আব্দুলের অবস্থা ভালো নয়। ওর পরিজনরা কলকাতায় নিয়ে যায়। যমে মানুষে টানাটানি। অবশেষে বেঁচে যায় কিন্তু বাঁপায়ের মালাইচাকি ঠিকমতো সচল হয়না। ঠিক মত হাঁটতে পারেনা। আব্দুল লেখা পড়ায় ভালো। দুস্থ পরিবারে জন্ম। পড়াশোনার খরচ চালাতে নিজেই কোচিং সেন্টার খুলছে ।কম পয়সায় পড়ায়। মুসলমানদের হাতে জল খেলে জাত যায়, কিন্তু দুধে জাত যায়না। কম পয়সায় ভালো পড়ায় তাই হিন্দুদের ছেলে মেয়েরা ও পড়তে আসে। আবদুল টিউশনি করে আর সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতার পরীক্ষায় বসে।
মাধুরীর চোখে মুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ। আব্দুলের মনে কোনো আক্ষেপ নেই। একদিন মাধুরী নিজেই সে দিনের কথা তুলে কৃতজ্ঞতা জানায়। আব্দুল বলে, ওসব ভুলে যাও। মাধুরী বলে আমার জন্যই সারাজীবন আপনার ভোগান্তি। আব্দুল বলে, মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা কখন ঘটবে কেউ বলতে পারেনা।
মানুষ কখন ভালোবাসার জালে জড়িয়ে পড়ে কেউ বলতে পারেনা। আর সেই প্রেম যদি খাপছাড়া হয় তার বাঁধুনি কতটা মজবুত তা আমরা ইতিহাসে পড়েছি। মাধুরী আর আব্দুলের বিষয়টি কিছু পড়ুয়া বুঝতে পারে। মাধুরীর বাবা ত্রিলোচনের কানে পৌঁছে যায়। মাধুরীকে আর পড়তে পাঠায়না।
ঈশ্বর আছেন আল্লাহ আছেন। আব্দুল উচ্চ -প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরি পেয়ে যায় পাশের গ্রাম তক্তাপোলে। ওরা কিভাবে যোগাযোগ রাখে কেউ বুঝতে পারেনা। ডুবে ডুবে জল খায় শিবের বাবাও টের পায়না। শিবের মাথায় জল ঢেলে শিবরাত্রির দিন মাধুরী কোথায় গেল কেউ খুঁজে পায়না। দুদিন বাদে জানা গেল ওদের দুজনকে দীঘায় দেখা গেছে। ত্রিলোচন চোখে ধুতরো ফুল দেখে, আত্মসম্মান ধুলোয় মিশলো,উপরন্তু যজমানি বাড়িগুলো হাতছাড়া হয়ে যাবে। ওরা আর ডাকবেনা।
পুরোহিতরা জানে মূল্য ধরে দিলে সাতখুন মাফ। সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ত্রিলোচন দারোগাবাবু কে উপযুক্ত নজরানা দিয়ে ডায়েরি করে দেয়। দারোগারা জানে কান টানলেই মাথা চলে আসবে। আব্দুলের বৃদ্ধ আব্বাজান ও আম্মাকে সিধে গারদে ঢুকিয়ে দেয়। ম্যজিকের মত কাজ হলো সুড়সুড় করে আব্দুল থানায় হাজির হলো। কিন্তু ত্রিলোচনের কাজের কাজ কিছুই হলোনা। মাধুরীকে ঘরে তোলাতো দূরের কথা ওকে খুঁজেই পাওয়া গেলনা।
পুলিশ কোর্টে চালান করে দিয়েছে। ত্রিলোচন দুঁদে উকিল লাগিয়েছেন এমন কেস সাজিয়েছে যাবজ্জীবন জেল নিশ্চিত। কোনো দিন আর কোনো মুসলমান ছেলে হিন্দু মেয়েদের দিকে তাকাবারই সাহস পাবেনা। কেসটা এখন আড়াআড়ি ভাবে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হয়ে গেছে।
ধর্মাবতার, আমি জানতাম আমার পরিবার আমাকে সমর্থন করবেনা। তাই বাবার আপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই আমরা বিয়ে করলাম। দেশের আইন মেনেই। তারপর একবস্ত্রে চলে গেলাম শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুর-শাশুড়ি আমায় বুকে টেনে নিয়েছেন। কন্যার আদর দিয়েছেন। দিয়েছেন পুত্রবধূর প্রাপ্য মর্যাদা।
ওরা আমার স্বামী এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করেছে। অপরাধ? আমার বাবা থানায় নালিশ ঠুকেছেন। আমার আব্দুল নাকি আমাকে অপহরণ করেছে। ফুঁসলিয়ে বিয়ে। শুধু তাই নয়, জোর করে আমার ধর্ম পরিবর্তন করে দিয়েছে। এটা নাকি লাভ জেহাদ। স্বামীর বৃদ্ধ বাবা-মা ওই অপকর্মে ছেলেকে সাহায্য করেছে। সেজন্য তাঁরাও অভিযুক্ত। ওই দেখুন, ওই তিনজনই এই মুহূর্তে আপনার কোর্ট লক-আপে।
ধর্মাবতার! আপনাকে জানাচ্ছি, আমি স্বেচ্ছায় স্বামীর ধর্ম গ্রহণ করেছি। আমি নিষ্ঠাবান হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া এক নারী। যে পরিবারে শেখানো হয় স্ত্রীকে প্রকৃত স্বামীর সহধর্মিনী হতে। না হওয়াটাই ক্ষমাহীন অপরাধ, সীমাহীন পাপ। আমি সেই অপরাধ, সেই পাপ করতে রাজি নই। তাছাড়া, স্বামীর সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা, স্বাচ্ছন্দ্য, প্রেম, ভালোবাসা সমস্ত কিছু যখন গ্রহণ করছি, তখন তাঁর ধর্মটা গ্রহণ করতে দ্বিধা থাকবে কেন! আমি কোন অপরাধ করিনি।
আর, লাভ জেহাদের কথা বলছেন? হ্যাঁ ধর্মাবতার। আমরা লাভ জেহাদই করেছি। শুনেছি জেহাদ মানে ধর্মযুদ্ধ। আমরা ধর্মযুদ্ধই করতে চাই। মানবতার পক্ষে ধর্মযুদ্ধ। নারী-পুরুষের পবিত্র প্রেম ভালোবাসা দিয়ে। আমাদের ভালোবাসার ফসল হয়ে সন্তান আসবে। সেই সন্তানের ধর্ম হবে মানবতা। সেই ধর্মের জোরেই সে একসময় পূর্ণ হবে কারও অকৃপণ প্রেম-ভালোবাসায়। যে সুমহান নিজের জীবন দিয়ে মেয়েদের ইজ্জত বাঁচায় সে সকলের ঊর্ধ্বে। আমার মনের মানুষের সঙ্গে মানবতার ভালোবাসাই তো লাভ জেহাদ।
No comments:
Post a Comment