Thursday, 7 April 2022

ঘর--সন্ধ্যা রায়

ঘর--

সন্ধ্যা রায়

অচিন্ত্য দত্তের বাড়ি খিদিরপুর । অচিনত দত্তর মেয়ের নাম ববিতা, তার ডাকনাম বুবু। ছেলের নাম রণন, তাকে রাণি বলে সবাই ডাকে l স্ত্রীর নাম তৃষা। দত্তবাবু অনেক রাতে পার্টি করে

রাতে বাড়ি ফিরে এলে উনার স্ত্রীর সঙ্গে আর কোন কথা হয় না। তাই  সকাল বেলা স্ত্রী শুধালো, কালকে রাতে কোন পার্টি ছিল এত রাত্রে বাড়ি ফিরলে?কৈ আমায় বলনি তো?

দত্ত বাবু একটু রাগ চটা মানুষ বটে। এমনিতে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঝগড়া লেগেই থাকে। আর দুচার কথার পরেই তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠেন।

সকালে স্ত্রীর কথা শুনেই দত্তবাবুর মাথায় আগুন লেগে গেল, তিনি চিৎকার করলেন, বেরিয়ে যাও বেরিয়ে যাও ঘর থেকে,  তোমার থেকে অনুমতি নিতে হবে আমার? মোটা একটা বসতার  মতন দেখতে, কোন পোশাকে তোমাকে মানায় না, অসহ্য লাগে। আমার সাথে তোমাকে নিয়ে যেতে হবে ? সহ্য করতে পারিনা তোমাকে, বেরিয়ে যাও। তোমাকে নিয়ে পার্টিতে যেতে পারবো না। 

শুনে মেয়ে বলল, মানিয়ে নিতে পারো না বাবার সাথে তখন কেন সকালবেলা লেগেছ মা ! 

ছেলে বললো, বাবা মনে করে তুমি একটা আনকালচারড,  তারপরও তুমি কেন মেনে নিতে পারো না। তুমি কেন বুঝতে চাও না মা? 

দত্ত বাবু ছেলে মেয়েকে নিজের মত করে ভালো শিখিয়ে রেখেছ। 

তৃষ্ণা সকলের সুখ স্বাচ্ছন্দ দেখতে দেখতে কবে  নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে নিজেও জানে না। তৃষাকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল অচিন্ত্য। তৃষ্ণা এম এ  ইন ইংলিশ ছিল। তৃষা  একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরিও করতো। সে আজ সহ্য করতে পারলো না, ছেলে মেয়ের কথাগুলি, স্বামীর এই বঞ্চনা । সে ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে ঠিক করে নিল। সাথে সাথে তৈরি হয়ে সে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল । কারো সাথে কোনো কথা বলল না, কেউ তাকে জিজ্ঞাসাও করল না।

ও নিজেকে বলল, আস্তানা ঠিক পেয়ে যাব, আমি যাচ্ছি। এই বলে বেরিয়ে গেল তৃষ্ণা। 

একটু পরেই ববিতা বলল, আমার ড্রেস প্রেস করা নেই । টিফিন বক্স তৈরি নেই, আমি কি করে স্কুলে যাব, বাবা? 

অচিন্ত্য বাবু বললো, কাজের মেয়েটা ব্রেকফাস্ট করে দেবে, তৈরি হয়ে যাবে, স্কুলে চলে যাবে-- এরপর তিনি নিজে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলেন অফিসের উদ্দেশ্যে। কাজের মেয়েটা এলে চিন্তায় পরল। এমনটা কোনদিন হয় না ম্যাডামই তো সব বানিয়ে দেয়। সে যা পারল করে দিলো, তারপরে রণন আর ববিতা বেরিয়ে গেল স্কুলে। 

বিকেলে অচিন্ত্য ঘরে এসে দেখে দোরগোড়ায় কতগুলি জুতো কাল থেকে পড়ে আছে। কেউ সরায়নি, ব্যালকনিতে অনেক জামাকাপড় কাচা আগোছালো এখানে ওখানে পড়ে আছে। কেউ তোলার নেই।  রনি আর বুবু স্কুল থেকে ফিরেছে। অচিন্ত্য বলল, বুবু তুমি এসব জামা কাপড় গুলো গুছিয়ে ফেল-- 

বুবু পরিষ্কার বলল, ওসব মার কাজ, মা করবে , আমি করি না। 

অচিন্ত্য বাবু এবার রনিকে বলল, রনি তুমি জুতোগুলো গুছিয়ে তুলে রাখ তো সেলফে। 

রনিও বলল, আমি পারবো না বাবা, এটা মায়ের কাজ, মাই করে, মাকে বলো। মাকে তুমি   তাড়িয়েছে বাবা, এখন কাজ তো তোমাকেই করতে হবে। এখন রাতের খাবার কে বানাবে বল ? সেটাও তোমাকেই করতে হবে। তুমি মাকে কেন তাড়ালে বাবা ?

অচিন্ত্য বলল, আজ রাতে আমাদের হোটেলের খাবার খেতে হবে। সে সকালে উঠেই চিন্তায়  পড়ল । কাজ মানে  এতো কাজের সমুদ্র। ঠিক করলো আজ আর অফিসে যাবে না। ভাবলো তৃষা কত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে । সময় মতন খাওয়া-দাওয়া, সবকিছু সময় মত, যেন একটা অফিসারের  ঘর। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শান্তির নীড়। আমি শুধুই গঞ্জনা বঞ্চনা করি ওকে, বুঝতেই চাই না।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই কেন যে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম। সোজা সাপটা জবাবটা দিলেই ত মিটে যেত। এত মাইনে পাই একটা ভালো কাজের লোক রাখলেও নিজের খেয়াল রাখতে পারত। ভুলটা আমার। নাঃ ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। এটা আমার উচিত হয়নি।

 

অচিন্ত্য আজ অফিস যাইনি বলে ওর অফিস কলিগ কাজল আর ওর হাসবেন্ড বেড়াতে আসলো। এসেই প্রথম প্রশ্ন কিরে, আজ অফিস যাসনি কেন? 

অচিন্ত্য বলল, তৃষ্ণার মার শরীর খারাপ তাই ও ও বাড়ি গেছে । আমি ছেলে মেয়ে সামলাচ্ছি আর অফিস যাওয়া হল না। কাজল বলে উঠল, দিদিভাই নেই, তবে আজকে আর বিরিয়ানি খাওয়া হলো না। ওরা কিছুক্ষণ বসে ঘরে ফিরে গেল। 

সকাল হতেই অচিন্ত্য বন্ধু, রঞ্জনের ফোন এলো। রঞ্জন বলল, কিরে আজ সকালবেলা মন্দিরে গিয়েছিলাম । দেখলাম, ওখানে বৌদি লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগ খাচ্ছে। কি হল বল তো এতদিন এরকম তো কোনদিন দেখিনি? 

অচিন্ত্য বলল, আমি ফোন রাখছি পরে তোকে সব বলবো।

এই বলেই সে ফোন রেখে দিল। আর তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে কার নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি পৌঁছাল কালীমন্দিরে, দেখল তৃষা ওখানে ভোগ খাচ্ছে, কালীমন্দিরের চত্বরে বসে। অচিন্ত্য তৃষার কাছে গিয়ে ওর হাতটা ধরে সোজা চলে এসে কারের মধ্যে বসিয়ে দিল তৃষাকে। বিনা বাক্য ব্যয়ে অচিন্ত্য ঘরে পৌঁছে গেল। তৃষাকে জড়িয়ে ধরে বলল-আমার ভুলের সাজা আমার বাচ্চাদের দিও না । আমি ভুল করেছি, এ ভুল আর কখনো হবে না তৃষা। বাচ্চারা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বাচ্চাদের কাঁদতে দেখে তৃষ্ণা বলল, এ ঘর আমার এ ঘর ছেড়ে আমি কখনো যেতে চাইনি। আমি আর কখনো তোমাদের ছেড়ে যাবো না।

No comments:

Post a Comment

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল  রূপো বর্মন  একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যা...