যে যেখানে দাঁড়িয়ে --
তাপসকিরণ রায়
রমাকান্ত দেখেছেন মানুষের আর্থিক অবস্থা মানুষকে একটা স্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেমনটা তোমার সমর্থ তেমন ছাঁচে তোমায় চলতে হয়। তোমার চারপাশটাও তেমনি ভাবে গড়ে ওঠে।
রমাকান্তদের আর্থিক অবস্থা একদিন তেমন একটা ভাল ছিল না।
সেদিন রমাকান্ত রেশনের দীর্ঘ লাইনের শেষ দিকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার সময় গুনে যাচ্ছিলেন। মেয়ে-বৌদের তখন আলাদা লাইন। এক সময় মিষ্টি এক কণ্ঠ রমাকান্তর কানে এসে পৌঁছল, রমা দা, তুমিও আমাদের মত লাইনে দাঁড়িয়ে ?
চোখ তুলে তাকিয়ে ছিলেন রমাকান্ত, অনন্যা লাইনে দাঁড়িয়ে।
অনন্যা আবার বলে উঠেছিল, তুমি কেন ? রুমা কৈ ?
রমাকান্তর বোন রুমাই বরাবর রেশনের লাইনে দাঁড়ায়। অনন্যা ওর সঙ্গে এক স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। সেই সূত্রে অনন্যার ওদের ঘরে যাতায়াত ছিল। রমাকান্ত ছোট বেলায় যে একেবারে লাইনে দাঁড়াননি তা নয়। কিন্তু কিছুটা বড় হওয়ার পর আর তিনি লাইনে দাঁড়াবার মানসিকতা খুঁজে পেতেন না। মার বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি রেশন নিতে যেতেন না। এ জন্যে বাবার কাছ থেকে তাঁকে কড়া কথা শুনতে হত, লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা করে ? আমাদের মত গরীবদের এমনি লজ্জা করলে চলে ? বাবা আরও একটু রেগে গেলে বলতেন, তুমি কোথাকার লাটের বাট হয়ে গেছ ?
কথা সত্যি। উঠতি বয়সের রমাকান্ত তখন কিছুটা উড়ু উড়ু মন নিয়ে ঘুরে বেড়ান। ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট ছাড়া তাঁর পরতে ইচ্ছে হয় না--সেদিন অনন্যাকে তিনি বলে ছিলেন, রুমার শরীর খারাপ।
--ও, ছোট জবাব ছিল অনন্যার।
রেশনের দুটো লাইন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। এক সময় পেছনে দাঁড়ানো অনন্যা রমাকান্তর কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ছিল। এগোতে এগোতে রমাকান্তর হাত, কাঁধ এসে ঠেকছিল অনন্যার শরীরে। অনন্যা স্বাভাবিক, কিন্তু রমাকান্তর কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। এ অনন্যার দিকে তিনি কখনো আগে ভাল ভাবে তাকিয়ে দেখেননি। মনে হল যেন এই প্রথম তাঁর চোখ পড়ল। শ্যামলা রঙের মাঝে শ্রীময়ী আঁকের এক চেহারা, খুব সহজ সরল লাবণ্যময় এক চেহারা বলে মনে হল। ভিড়ের ঠাসাঠাসি অবস্থায় ওর মুখমণ্ডলে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। মাথার এলোমেলো কেশ বিন্যাসের ফাঁকে ফাঁকে তার চারপাশের ছোট ছোট চুলগুলি শৈল্পিক ধাঁচে ফিনফিন উড়ছিল। অনন্যার চোখ রমাকান্তের চোখে এসে পড়ল। রমাকান্ত তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে নিলেন।
--রমা দা, আপনি একটু ঘুরে আসুন না বাইরে থেকে ? খুব ঘামছেন আপনি।
তাকালেন রমাকান্ত অনন্যার দিকে। শান্ত এক মুখচ্ছবি, কথায় তার সহানুভূতির সুর। কিন্তু তার বেশী কিছু নয়, চেহারা স্বাভাবিক, মুখের হাসি সীমিত, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে না। এমনি একটা মেয়ে যে আছে তাঁদের গরীব ঘরের সীমান্তে তিনি যেন ভাবতেই পারেননি। কৈ আগে তো রমাকান্তর চোখে কোন দিন এমনি ভাবে পড়ে নি ! অথচ এক পাড়ায় বাস তাদের। হ্যাঁ, তাদের মত গরীব জরাজীর্ণ ধাঁচের ঘরের দিকে, সে সঙ্গে রিক্ত অর্থহীনতায় ভোগা পরিবারের দিকে কোন দিন তেমন ভাবে রমাকান্তর নজর পড়েনি হবে।
--রমা দা, আমি আপনার লাইনটা দেখব, আপনি যান না, বাইরের হাওয়ায় একটু ঘুরে আসুন, মেয়েটি আবার বলে উঠলো। অনন্যার শান্ত মুখে রমাকান্ত আবার সহানুভূতির ছাপ দেখতে পেলেন। ভাল লাগছিল তাঁর, এমনি একটা মেয়েকে আলাদা ভাবে কে না পছন্দ করতে চাইবে ? ওদের পরিবারের দৈন্য অবস্থার মধ্যে মেয়েটিকে যেন মানায় না। ওদের ঘর, জীবনযাত্রার মাঝে কেমন করে এই মেয়েটি হারিয়ে যেতে পারে ?
--না--ঠিক আছি আমি, রমাকান্ত সেদিন বলেছিলেন। আসলে ভালো লাগছিল—বীতশ্রদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়েও তাঁর যেন সেদিন খুব ভালো লাগছিল। এই একটি ঘণ্টায় তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছিল ! অনন্যার মনের সঙ্গ পাবার জন্যে তাঁর মন যেন লালায়িত হয়ে উঠছিল। তিনি বলেছিলেন না, আমার কিছু অসুবিধা হচ্ছে না।
রেশন তোলার সময় ব্যাগ ধরে সাহায্য করেছিল অনন্যা। ও সেদিন অন্য এক একক চেহারা নিয়ে রমাকান্তর সামনে ধরা দিয়েছিল।
তারপর দেখা হত অনন্যার সঙ্গে, কথা হত। অনন্যা স্বাভাবিক আর রমাকান্ত ছিল কিছুটা উচ্ছল। এমনি করে ওরা ধীরে ধীরে একে অন্যের কাছে এগিয়ে এসেছিল। এবং একটা সময় এসেছিল যখন উভয়ের সান্নিধ্য-ভালবাসা প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল।
সময় তার ধর্মে এগিয়ে চলছিল। ইতিমধ্যে রমাকান্ত পাস করে চাকরি পেয়ে দূর দেশে বেরিয়ে গেল। চাকরির পাঁচটা বছরও কেটে গেল। তিনি বাবা মাকে নতুন ফ্যাটে নিয়ে তুললেন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় মাইনেতে রমাকান্ত তখন ধনবান। দৈন্য অবস্থার লক্ষণগুলি তাঁদের চেহারা পোশাক থেকে ক্রমশ: সরে গিয়েছিল।
অনন্যার সঙ্গে গোনা কয়েক বার দেখা হয়েছে রমাকান্তর। কিন্তু আগের সেই চোখ যেন তিনি হারিয়ে ফেলে ছিলেন। অনন্যা তাঁর চোখে অনেকটা মলিন মনে হয়েছিল। দুঃখ দারিদ্র্যতার জরাজীর্ণ ছাপ যেন অনন্যাকে ঘিরে ধরছিল।
সত্যি কি তাই--সত্যি কি অনন্যা তার রূপ গুণ সৌন্দর্য স্বভাব হারিয়ে ফেল ছিল ? রমাকান্ত বুঝতে পারছিলেন না। অনন্যাও চেহারা ছবিতে তার প্রেমিক রমাকান্তকে চিনে উঠতে পার ছিল না।
--তোমরা তো চলে যাচ্ছ, আমার কি হবে রমা দা ? অনেক কষ্টে অনন্যা বলতে পেরেছিল কথাগুলি।
--তুমি তো আমার থাকবেই অনন্যা, আমি আসব, তোমায় দেখে যাব, রমাকান্তর তাঁর আওয়াজে তখনও বুঝি সেই আপনত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেননি!
একদিন সময় আড়াল করে নিলো সব। রমাকান্ত অনন্যাকে ভুলতে বসলো। অনন্যা এক সাধারণ মেয়ে, বস্তির সমতুল্য এক বাসিন্দা বই তো নয় ! তার বেশবাস বড় নগণ্য, অনুজ্জ্বল বলে মনে হত রমাকান্তর। এখনকার রমাকান্ত যে বড় বর্ণময়--চাকচিক্যের মাঝে চকমকি পাথরের মত উজ্জ্বল ! তাঁর কি করে মনে হবে অনন্যা তাঁর জীবন সঙ্গিনী হতে পারে ? ওর বুভুক্ষু পরিবারকে তিনি কি নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন ? না, তা আর সম্ভব নয়--শত বর্ণাঢ্যের মাঝে প্রসাধনী রঙচঙ মোহ তখন তাঁর যে পছন্দ ! সভ্যতার রঙরাংতার মোড়া দেহই যেন তাঁর একান্ত কাম্য। ধনীর মেয়েদের মাঝে তিনি কিছুতেই অনন্যাকে মানিয়ে নিতে পারেন না। আর তাই বুঝি একদিন তিনি সব কিছু ভুলে গিয়ে এক ধনবান বাবার আধুনিকা মেয়েকে স্ত্রী বলে গ্রহণ করেছিলেন।
বিয়ের পরের দশটা বছরও কেটে গেল। রমাকান্ত তখন তাপনিয়ন্ত্রিত ঘর, গাড়ী ছাড়া চলতে পারেন না। একটুতেই তিনি হাঁপিয়ে যান, তাঁর ফর্সা মুখে লাল ছোপ পড়ে যায়। আজকাল অনন্যা তাঁর স্মৃতিতে মাঝে মধ্যে এসে উদয় হয়। নিজের স্ত্রীর দায়বদ্ধতা বড় বেশী হয়ে তাঁর চোখে ধরা পড়ে। স্ত্রীর ব্যবহার কাঠিন্য সময়ে অসময়ে তাঁকে বেশ পীড়া দিয়ে যায়। এসবের মাঝে তাঁর হঠাৎ হঠাৎ অনন্যার কথা মনে পড়ে যায়। একবার মনে হত তিনি যদি অনন্যাকে বিয়ে করতেন তা হলে বোধহয় এমনটা হত না। কিন্তু না--ওই অর্থহীন দীনতা, ওই পরিশ্রমের ঘাম চিপচিপ অবস্থা তিনি কি বরদাস্ত করতে পারতেন ? রমাকান্ত দেখেছেন, সংসারের জব্বর দায়- গ্রস্ততা, অর্থের স্বচ্ছন্দ সীমার মাঝেও শান্তির দীনতা, মনের অমিল বোঝার টানাপোড়েন। সব মিলিয়ে মনের মাঝে কোথাও যেন শূন্যস্থান থেকেই যায় ! কামিনী কাঞ্চন দপ জ্বলে উঠে তার আলো হারিয়ে ফেলে। এক অদ্ভুত সুখ দুঃখের দহনে পুড়ে যেতে থাকে মনের গভীরতা। তাই বুঝি এক মেঘলা দিনে রমাকান্ত একলাটি বেড়িয়ে পড়েছিলেন কোন অজানায় পাড়ি দিতে !
সেদিন রমাকান্ত নিজের অজান্তেই কি এসে পড়েছিলেন তাঁদের সেই গরীব হতশ্রী গ্রামে ? তিনি সামনে দেখতে পেলেন তাঁদের জরাজীর্ণ সেই পুরানো ঘরটাকে। আগের মতই সেটা পড়ে আছে বৃদ্ধ ন্যুব্জ ভাব নিয়ে। ধীরে ধীরে ড্রাইভ করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ একটা মুখ তাঁর নজরে পড়ে গেল। চেনা একটা মুখ। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
অনন্যা না ! চমকে উঠলেন রমাকান্ত। থেমে গেলেন তিনি। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে বাইরে এসে নেমে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, অনন্যা, আরও কালো হয়ে গিয়েছে, সেই উজ্জ্বলতা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে। শরীরে তার ময়লা শাড়ি জড়ানো, ঝুলঝুলে অমাপের একটা ব্লাউজ তার বুকে জড়ানো। তার চোখের কোলে কালো ছোপ। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন রমাকান্ত, সে অনন্যা হিয়ে গেছে--অর্থহীনতায়, বুভুক্ষায়, দুঃখ কাতরতায়। আর এইসব লক্ষণগুলোই তো মানুষকে বোধবুদ্ধিহীন নিম্ন মাত্রায় টেনে নেয়।
এক গ্লাস জল নিয়ে অনন্যা কখন যেন রমাকান্তর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আপনাকে খুব পরিশ্রান্ত লাগছে, রমা দা ! আপনার জন্যে জল এনেছি, হাত বড়িয়ে জলের গ্লাস এগিয়ে দিল অনন্যা।
সত্যি এ মুহূর্তে ভীষণ তৃষ্ণার্ত রমাকান্ত, এত কিছুর পরেও অনন্যা তা বুঝতে পেরেছে ? জলের গ্লাস তিনি হাতে তুলে নিলেন। অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, কেমন আছো, অনন্যা ?
অনন্যা কিছু বলল না, তার মুখে এক চিলটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
না, কোথাও নেই, সেই অনন্যার লক্ষণ আজের অনন্যার মধ্যে কোথাও খুঁজে পেলেন না রমাকান্ত। জলটা হাতে ধরে আছেন তিনি।
--খুব পরিশ্রান্ত লাগছে আপনাকে, গরমে আপনার মুখটা কেমন লাল পড়ে গেছে ! অনন্যার কুণ্ঠিত গলা শুনতে পেলেন রমাকান্ত।
এক রাশ ব্যর্থতা জমা পড়ে আছে রমাকান্তর মনে। তিনি জলের গ্লাস মুখের কাছে তুলেও নামিয়ে নিলেন। না, গ্লাসের চেহারা ভালো লাগছে না--আর তা ছাড়া জলের রঙও কেমন যেন ঘোলাটে ! পিউরিফাই জল ছাড়া তিনি তো কিছুই মুখে দিতে পারেন না—রমাকান্ত যেন আপন মনেই বলে উঠলেন, না, একদম জল তেষ্টা নেই দেখছি--
রমাকান্ত ভরা জলের গ্লাসটা ফেরত দিতে হাত বাড়ালেন। অনন্যা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। নীরবে জল ভরা গ্লাসটা সে নিজের হাতে ফিরিয়ে নিলো।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment