Wednesday, 6 April 2022

আমার কথা-- ঊশ্রী মন্ডল

আমার কথা
ঊশ্রী মন্ডল


                              আমার ছোটবেলাটা কেটে গিয়েছিলো দুর্গাপুরের অলিতে গলিতে,ডেয়ারি কলোনির ফ্লাটে থাকতাম,সেই সময়টা খুব সুন্দর ছিলো l হাসি গল্পে খেলাধুলা পড়াশুনার মধ্যেই কাটছিলো অথচ ভরপুর দারিদ্র ছিলো, বাবা পরলোক গমন করার পর আমরা সকলেই অসহায় হয়ে পড়েছিলাম, অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে মা আমাদের মানুষ করে তুলেছিলেন l যখন যৌবনে উত্তীর্ণ হলাম মা বিয়ে দিয়ে দিলেন , এসেছিলাম বধূ হয়ে পানাগড়ে l  
             অনুন্নত জায়গা, শিক্ষার জন্য ভালো স্কুল কিংবা চিকিৎসার জন্য হসপিটাল ছিলো না, সবেধন নীলমনি একটা হেলথ সেন্টার ছিলো, তাতেই যা চিকিৎসা হবার হতো নয়তো দুর্গাপুরেই যেতে হতো,স্কুল কলেজেও পড়ার জন্য ঐ দুর্গাপুরেই যেতে হতো, কর্মেরও কোনো সুযোগ ছিলো না l 
       যাই হোক,স্বামীর কর্মস্থল ছিলো দিল্লিতে,তাই নয় মাসের সন্তানকে কোলে করে দিল্লিতে চলে গিয়েছিলাম l ওখানে দীর্ঘ সতেরো বছর পর পরিজনদের আগ্রহে ফিরে এলাম পানাগড়ে , বাড়ি বানালাম, সামনে একটু জমি পড়ে ছিলো তাতে সবজি ফলাতাম, পাড়ার প্রতিবেশীদের দিতাম নিজেও খেতাম মনের আনন্দে l
                 কাঁকশা থানার ঠিক পিছনে কুলু পুকুর নামে একটা পুকুর আছে, তার ঠিক পাশেই আমার ঘর l পুকুরের চারিধারে অনেকটা জায়গা বড়ো বড়ো গাছে ঘেরা,একমানুষ সমান ঝোপঝাড়ে ভর্তি l পুকুরের জল বড়োই নোংরা, ওখানেই সকলে বাসন মাজে, কাপড় কাচে, আবার এদিক ওদিক চোরা নজর হেনে মূত্রও ত্যাগ করে, অবাক কান্ড ঐ জলেই স্নান করে মুখ ধোয়, মাগো কি ঘেন্না l আমি অবশ্য কোনোদিন ঐ পুকুরে যাইনি, কেননা ঘরেই আমার সব বন্দোবস্ত ছিলো l
             পঞ্চায়েত থেকে ঘরে ঘরে মলমূত্র ত্যাগের জন্য ঘর বানিয়ে দিয়েছিলো l তবুও কেন জানি না, ঐ স্থানে না গিয়ে পুকুরের পাশে ঝোপঝাড়ে পায়খানা করতে আসতো সারা পাড়া জুড়ে l কি গন্ধ, তেমনি মশা মাছি -দিনেদিনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে লাগলাম l মাঝে মাঝে তক্কাতক্কি লেগে যেতো l আজব চিন্তাধারা ছিলো ওদের, বন্ধ ঘরে নাকি বাহ্য হয়না, তাছাড়া ট্যাংকি ভরে গেলে কে পরিষ্কার করবে ?  
      সেদিন পাশের বাড়ির দিদিটা স্বামীর অত্যাচারে গায়ে আগুন লাগিয়ে মরে গেলো l স্বামী ছিলো  পাঁড়মাতাল, রোজগারপাতি কিছুই করতো না, পেটে দেবার নয়,পিঠে দেবার গোসাঁই ছিলো l তবে,হ্যাঁ একটা গুন ছিলো, ভালো চুরি করতে পারতো, দিনের বেলায় ছিলো ভদ্রবেশী ভালো লোক, রাত্রি হলেই বেরিয়ে পড়তো নিজকর্মে l ভরপেট মদ খেয়ে বৌটারে মুখবেঁধে পিটাতো, রাগে দুঃখে মরে যেন শান্তি পেলো,ওদের বাড়ির দিকে তাকালে গাটা ছমছম করতো l আশ্চর্য কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই ঐ বদমাশ আবার বিয়ে করে বসলো, সত্যি বাংলাদেশে পাত্রের আকাল পড়েছে, তাই ঠিকমতো খোঁজখবর না নিয়েই মেয়েদের পাত্রস্থ করছে l সৎমা কি পরের বাচ্চাকে ভালো বাসতে পারে, তাই কচি কচি বাচ্চাগুলো খেতে পেতো না,বেশিভাগ দিনই শুকনো মুখে খাবারের আশায় বাড়িতে বাড়িতে ঘুরতো,দেখে বড়ো মায়া লাগতো,মাঝে মাঝে সাহায্য করতাম l আমরাও দিন আনি দিন খাইয়ের দলেরই লোক, তাই বিশেষ একটা সাহায্য করতে পারতাম না l একসময় ওরা দক্ষচোর হয়ে গেলো এবং ধনীও হয়ে উঠলো l যাক গে, ওদের কথা ভেবে আমার কি লাভ ,তাই নিজের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগলাম, সে কলেজে পড়ে পল.সাইন্স এ অনার্স নিয়ে রানীগঞ্জে, আসতে আসতে রাত্রি হয়ে যায়, যতক্ষণ না ঘরে ঢোকে ততক্ষন বেশ চিন্তায় থাকি l
           কার্যোপলক্ষে আমার স্বামী আবার চলে গিয়েছেন গোয়ায় l সেদিন স্বামী বলছিলেন উনি নাকি লিফটে আটকা পড়ে গিয়েছিলেন, দম বন্ধ হয়ে আসছিলো, কি করে বেরোতে পারবে ভেবেই পাচ্ছিলো না l নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে ফোনও করতে পারছিলো না l ভাগ্যিস ওখানকার লোকেদের হঠাৎ মনে পড়ে রবীন মন্ডল নিখোঁজ ,তাই খোঁজ করতে থাকার পর বন্ধ লিফটের হদিস পায়, তারপর অনেক  কষ্টে গেট কেটে বের করে আনে, একথা শুনে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম l
       
           আমি তখন চাকরি করতাম একটা পেট্রল পাম্পে, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে l সেদিন দিদি বললো, মায়ের শরীরটা ভালো নেই, তোকে দেখতে চাইছে, একবার ঘুরে যাস l বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমার আজকে ঘরে ঢুকতে একটু দেরী হয়ে যাবে, চিন্তা যেন না করে, দরকার পড়লে দিদির বাসাতেই থেকে যাবো, একটু সামলে নিয়ো l
         মায়ের কাছে গিয়ে দেখি,মা শুয়ে আছে ক্লান্ত শ্রান্ত রোগজীর্ণ মুখ, কিন্তু ভালো আছেন আগের তুলনায়, কিছুক্ষন বসে গল্প করলাম l এবার ছেলে ও স্বামীর জন্য মন খারাপ করতে লাগলো l ভাবছি, কাল সকালে ছেলে কলেজে যাবে, ওনারও ডিউটি সকালেই, সব সামলে নিতে পারবে তো ? বেরিয়ে পরি, এখন বেরিয়ে পড়লে পানাগড় যাবার লাস্ট বাসটা পেয়ে যাবো, যেই না ভাবা অমনি উঠে পড়লাম , মা বললেন, থাক না আজকে এইখানে কালকে এখান থেকেই ডিউটিতে চলে যাস l আমি নানান অজুহাত দেখিয়ে মাকে মানিয়ে হন্টন দিলাম মুচিপাড়ার উদ্দেশ্যে l এসে শুনি লাস্ট বাস চলে গেছে,মায়ের কাছে ফিরে যাবো নাকি, ভাবতে ভাবতে দেখি স্টেশনে যাবার একটা বাস আসছে l ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারলে  ব্ল্যাক ডায়মন্ডটা পেয়ে যাবো, বাসে উঠে পড়লাম l স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে শুনি ট্রেন লেটে চলছে, অগত্যা অপেক্ষা করতে লাগলাম, অবশেষে ট্রেন এলো, চড়ে বসলাম এবং পানাগড়ে এসে নামলাম l গ্রামাঞ্চল তো একটু রাত হলেই নিঝুম হয়ে যায় l 
       হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে আমাদের পাড়ায় এসে পৌছালাম, একটু শর্টকাট নিলাম, কুলু পুকুরের পাশ দিয়ে যে সরু রাস্তাটা গিয়েছে তা ধরলাম l একটু এগিয়ে দেখি এক মহিলা পুকুর থেকে উঠে আসছে, বলে, কে যাও গো..গুড্ডুর মা নাকি ? আমি বললাম,' হ্যা ' , সেও আমার সাথে হাঁটতে লাগলো, সে নানান কথা বলতে লাগলো, বলল, ' তালের বড়া করবে তো? আমি আজকেই হাট থেকে তাল কিনেছি, তুমি কেননি ? 'আমি বললাম, 'সারাদিনের পরে এই ঘরে ঢুকছি, কোথায় তাল পাবো পরের হাটে কিনে নেবো |' হটাৎ খেয়াল করি , ফকিরের মা যেন লম্বায় আমার থেকে একটু বেশী বেড়ে গেছে , অথচ ওতো অনেক ছোটোখাটো মানুষ ! ভাবতে ভাবতে চলছি, আবার পাশে তাকিয়ে দেখি ওমা ও যে একটু একটু করে লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তাল গাছতার পাশে যেই দাঁড়ালাম অমনি সে হাত বাড়িয়ে দুটো তাল পেড়ে আমায় দিলো, আমার তো ভয়ে হাত পা ঠক ঠক করে কাঁপছে, বলে উঠলাম, ' হে রাম, তুমি এটা কি করে করলে  ? ' যেই না বললাম, অমনি সে বলে উঠলো,   ' দূর ছাই, এই শত্তুরটার নাম নিতে কে বললো ? জানো না,হাট থেকে ফিরেই আমি হার্টফেল করে মরে গেছি, তারপরই তো ভূত হয়ে গেছি l ভাবছিলাম এবার তোমার ঘাড় মটকাবো, তা হতে দিলে না, এখন এবারের মতো গেলাম,পরের বার যদি মওকা পাই অবশ্যই ঘাড় ভাঙবো তোমার l' আমি ভয়ের চোটে ও বাবা, ও মা বাঁচাও গো বলে চিৎকার করে ছুট লাগালাম, একবার হোঁচট খেয়ে পড়ি,আবার উঠে ছুট লাগাই, পিছন থেকে শুনতে পাচ্ছি হি হি হি হি হাসির শব্দ l কোনোরকমে প্রাণ হাতে নিয়ে ঘরে এলাম,সেদিন থেকে আর ঐ পুকুরের রাস্তায় যাইনি l
                পেট্রল পাম্পের মালিকানা বদল হওয়াতে আমার চাকরি গেলো, অনেক চেষ্টা করেছিলাম, বয়েসের অজুহাতে সুযোগ পেলাম না, সকলেরই  
ড্যাশিডুশি মেয়ে চাই l এখন আমি আর আমার ছেলেই থাকি, ছেলে কলেজে বেরিয়ে গেলে ভীষণ একা লাগে , মাঝে মাঝে অবশ্য দুর্গাপুরে মায়ের সাথে দেখা করতে যাই l কিছুই করার নেই তাই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করি, এই ভাবেই সময় কেটে যায় l

No comments:

Post a Comment

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল  রূপো বর্মন  একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যা...