অদৃশ্য অন্ধকার
আজকাল কেন জানি সন্ধের একটু পরে, মায়াময় রাত্রির শুরুতে ঊর্মির ভিতরে এক অদ্ভূত ছটফটানি শুরু হয়ে যায়। কিছুতেই আর বই -খাতা নিয়ে বসতে ইচ্ছে করে না। যমুনাকূলে কদমতলীতে কালার বাঁশি শুনে রাধিকার মন যেমন উচাটন হয়ে উঠতো, ঠিক তেমনিই সন্ধের পর রাত্রির শুরুতে কেবলে সুপারহিট নাচাগানার সিনেমা শুরু হলে বই -খাতা রেখে উঠে যেতে ইচ্ছে করে ঊর্মির।
কিন্তু পারে না। কারণ সজল অল্প বয়সের গৃহশিক্ষক হলেও খুবই কড়া প্রকৃতির। তবু সুযোগ পেলে ষোলো পেরিয়ে সতেরোয় পড়া ঊর্মি ছ'সাত বছরের বড়ো সজলের সঙ্গে বেয়াদবি করতে একেবারে ই কসুর করে না। সালোয়ার কামিজ পরা । ফর্সা, উজ্জ্বল চেহারার ঊর্মি, তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে উচ্ছ্বল জলতরঙ্গর ঢেউ তুলে এঁকেবেঁকে এক হেমন্তের সন্ধেয় জানতে চাইলো, 'পাড়ায় নাকি হোলনাইট ফাংশান হবে? কলকাতা আর
বোম্বের নায়ক- নায়িকা আসবে?'
ঊর্মির এই শারীরিক ভাষায় আর হঠাৎ এইসব খাপছাড়া প্রশ্ন করায় সজল ভিতরে ভিতরে রেগে যায়। রেগে গিয়েও কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না ঊর্মিকে। যদিও এখন আর ঊর্মিকে ধোঁয়াওঠা কমজোরী হারিকেনের আলোয় পড়াতে হয় না। টিউব লাইটের উজ্জ্বল আলোয় আর সিলিং ফ্যানের মনোরম হাওয়ায় চেয়ারে বসে পড়ায় ঊর্মিকে। তবু কেন জানি সজলের ভিতরে একটা অসহিষ্ণুতা ও বিরক্ত বোধ থেকেই যায়। কেন জানি সজলের মনে হয় এর থেকে ভাঙাচোরা হারিকেনের ধোঁয়াওঠা আলো- আঁধারি আর ভ্যাপসা গুমোটের ঘেরাটোপ ভালো ছিল।
এখন এই আলোর রোশনাইতে ঊর্মির পড়তে বসার ভঙ্গিমাটাই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ঊর্মির সাজসজ্জা, পোশাক আর আদব - কায়দায় এমনকি শারীরিক ভাষা ও চোখের দৃষ্টিতে ও এমন কিছু অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে যা সজলের একেবারেই ভালো লাগে না। কেন জানি সজলের মনে সে যেন এক দুর্ভেদ্য রহস্যর
অদৃশ্য অন্ধকার ঘেরাটোপে হারিয়ে যাচ্ছে। বৈদ্যুকরণের পর এখন প্রতি ঘরেই টেলিভিশন। তার সঙ্গে কেবলের প্রবেশ। সারারাত ধরে নাচা গানার সিনেমার ভিডিও চালিয়ে খানাপিনা হয়। এসবের মায়ামোহে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে সাবান, শ্যাম্পু, স্নো- ক্রিম- পাউডার থেকে গর্ভনিরোধক পিলের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত। বাদ যাচ্ছে না
কোনো কিছুই। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বোকা বাক্সের থেকে তরুণ - তরুণের একান্ত মনের মণিকোঠায় পৌঁছে যাচ্ছে একান্ত সংগোপনে। এইতো এখন ঊর্মির পরনে বাহারি সালোয়ার কামিজ। হাত - পায়ের নখে দামী নেইল পলিশ। চুলে শ্যাম্পু। চারদিকে অসংখ্য বিউটি পার্লার, টেলিফোনবুথ, ফুডপার্ক। বিগবাজার, আয়োনেক্স, সাবান, শ্যামপুর বিজ্ঞাপনে লাস্যময়ী মায়াবী হাতছানিতে বারবার পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া। লেখাপড়ায় মনোযোগ দেবার জন্য বারবার বকাঝকা করেও ঊর্মিকে শোধরাতে পারে না সজল।
বললে, ঊর্মিও আজকাল তর্ক করতে ছাড়ে না। বলে, 'সবাই তো যাচ্ছে।সিনেমায়, বিউটিপার্লারে, শপিংমলে। দল বেঁধে হোলনাইট ফাংশানও দেখছে। আর কিনা আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম...আপনি বুঝি জানেন না? আপনার বন্ধুরাই তো করছে।'
'আমার বন্ধুরা!'
এবার যেন সজল নিজের কাছে নিজেই ধরা পড়ে যায়।
'হ্যাঁ। আপনার বন্ধুরাই তো। শ্যামলদা, কাজলদা, প্রবীরদা এরাই নাকি করছে? সবাই জানে আর আপনি জানেন না।' বলতে বলতে ঊর্মি যেন একটু অভিমানে মুখ ভার করে থাকে।
ঊর্মি এতসব জানে। আর সেকি না... নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয় সজলের। সেতো জানে, সেদিন বর্ধিত নাগরিক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এত নিম্নবিত্ত ঘন বসতিতে জোর, জবরদস্তিপূর্বক চাঁদা তুলে সারা রাতব্যাপী জোরে মাইক বাজিয়ে ফাংশান করা যাবে না। নাগরিক কমিটি যখন অনুমোদন দেয়নি তা হলে ফাংশান কী করে হতে পারে? যেখানে সারারাত ব্যাপী জোরে মাইক বাজানোর উপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে? সেখানে কী করে সারারাত ধরে জলশার অনুমোদন পেতে পারে সেটা কিছুতেই সজলের বোধগম্য হয় না। যেন সে এক গোলকধাঁধার মধ্যে নিজেই থমকে যায়। সাধারণ মানুষের থেকে জোর করে চাঁদা তুলে অপসংস্কৃতির আয়োজনের বিরোধিতা তো এতদিন আমরাই করে এসেছি। আর এখন ক্ষমতায়নের পর আমরাই সেটা কি করে করতে পারি? সেই জিজ্ঞাসাটা সজলের ভিতরে ঘূণপোকা কুরে কুরে খেতে থাকে। সেদিনের সেই বর্ধিত নাগরিকসভার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল শ্যামল, কাজল, বদন, কালুরা। তাদের একটাই বক্তব্য ছিল যে চারিদিকে সবাই হৈমন্তীর শুক্লপক্ষে সারারাত ব্যাপী কলকাতা - মুম্বাইয়ের নায়ক - নায়িকাদের সমাবেশে জলশার আয়োজন হচ্ছে তখন আমাদের ছেলেরাও চাইছে সেটা করতে। সেটাই নাকি এলাকার বেশিরভাগ ছেলেমেয়েদের ডিমান্ড। না হলে?
জয়ন্তীর মায়ের কাছে হয়তো সজল অন্য কারণে অপরাধী। ভীষণভাবে অপরাধী। জয়ন্তীর বাবা ছিলেন একজন দক্ষ বিড়ি শ্রমিক। সেরা কারিগর। বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে যে অসুখটা প্রায় বিড়ি কারিগরদের হয়ে থাকে, সেটাকে অনেকেই বলে রাজ রোগ। মানে যক্ষ্মা। মানে টিবি। রোগে দীর্ঘদিন ভুগে ভুগে পরিবারটিকে সর্বস্বান্ত করে শহীদ হবার পর জয়ন্তী কালীমাসীর সঙ্গে কলকাতা না মুম্বাই কোথায় যেন নাচতে যাবার বাহানায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে । গেছে তো গেছেই। বিগত এক বছরে আজ পর্যন্ত সে ফিরে আসেনি। কোনো টাকাও পাঠায়নি। জয়ন্তীর মা প্রায়দিনই সন্ধের পর রাত্রির শুরুতে অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে সজলের কাছে এসে কান্নাকাটি করে জয়ন্তীর খোঁজ জানার জন্য। এইরকম আরো অনেক জয়ন্তীই নাকি আছে খালপাড়ের ওদিকে। যারা এরকম বাইরে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। আর ফিরে আসেনি।
ঊর্মি তার ভিতরের অভিমান ভিতরেই প্রতিরোধ করে জানতে চাইল, ' সত্যি আপনি জানেন না ?'
সজল ঊর্মিকে কী বলবে ভেবে পায় না। ঊর্মি যখন তাঁকে বিশ্বাস করতে চাইছে না তখন...!
ঊর্মিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সজলের মনে হলো সে নিজেই যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ।
No comments:
Post a Comment