মালতী ও একটি প্রশ্ন
রথীন্দ্রনাথ রায়
মালতীর হাসপাতাল থেকে বেরোতেই পাঁচটা । কাজ যেন আর শেষ হয়না । রেবাদিও আসতে দেরি করল তাই ওরও দেরি হল । বাস থেকে নেমে প্রায় চার কিমি পথ । ভাই অমলটা সাইকেল নিয়ে প্রতিদিন আসে । আজও আসবে । ওর আব্দার ওকে একটা কম্পিউটার কিনে দিতে হবে । মালতী বলেছে দেবে । তবে শর্ত মাধ্যমিকে ওকে এক থেকে দশের মধ্যে রেজাল্ট করতে হবে ।
অমল বলেছে, তুমি দেখে নিও , আমি এক থেকে দশের মধ্যে থাকছি ।
খুব লড়াকু অমলটা । বইপত্র তেমন কিছু পায়নি । তবু রেজাল্ট করে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো । পরের মাসে দেখা যাক ।
বাস থেকে যখন নামল তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে । অমল সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েই ছিল ।বলল, দিদি তোর এত দেরি হল কেন রে ?
-- হসপিটালে স্টাফ কম ছিল তাই বেরোতে দেরি হল ।
--ওঠ ।
সাইকেলে ওঠে মালতী । আজ পরিবেশটা কেমন থমথমে । একটা মাত্র চায়ের দোকান খোলা রয়েছে । তার সামনে একটা লোক কাকে যেন ফোন করছে । লোকটাকে চেনে কিন্তু নামটা মনে করতে পারছেনা ।
বেশ জোরে সাইকেল চালাচ্ছে অমল । অন্ধকার হলেও মোটামুটি চারপাশটাকে দেখা যায় । দুপাশে নানারকমের গাছের সারি ।বেশ কিছুটা আসার পর একটু জঙ্গল মতো জায়গায় কাদের যেন গলার আওয়াজ পেল । কারা কিসব বলছে । ভয় পেল মালতী । আর একটু এগিয়ে আসতেই মুখের ওপর গামছা জড়ানো কয়েকজন তাদের সামনে এসে সাইকেলটাকে আটকাল ।
-- নাম বোকাচোদা । কে হয় রে তোর ?
-- দিদি ।
-- ভাগ শ্লা দিদি ভাতারি ।
লোকটা একটা থাপ্পড় মারে অমলকে ।
পাল্টা থাপ্পড় মারে অমলও ।
মালতী ওদেরকে বাধা দিতে চায় । বলে, কেন মারছ ওকে ?
-- থাম মাগি । রেতের বেলায় নষ্টামি করবে আর মারবে না । ছেলেটার মুখটা বেঁধে দে । আর এ মালটাকে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে চল ।
কিন্তু তার আগেই পাশে পড়ে থাকা বেশ বড় একটা ইঁট নিয়ে অমল ওদের একজনের মুখে ছুঁড়ে মারল । 'বাবাগো ' বলে চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা । আর একজনকে একটা লাথি মারতেই অপরজন রিভলভার বের করে গুলি করল । একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল অমল ।
-- বাঁচাও ।
চিৎকারটা জঙ্গলের মধ্যে একটা প্রতিধ্বনি তুলে হারিয়ে গেল । কিন্তু মালতীকে বাঁচাতে রাস্তার পাশে সেই সুনসান জঙ্গলে কেউ এলোনা । নিজেকে বাঁচাতে ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে কাঁটা ঝোপের মধ্যে পড়ে গেল মালতী । তারপর ?
না । আমি পারছিনা সেই দৃশ্যের বর্ণনা করতে ।
কিছুক্ষণ পরে সেই রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম আমি ও আমার এক বন্ধু । বাইকের আলোয় দেখে মনে হল কারা যেন জঙ্গলের ভেতর ছুটে পালাল । কিছু একটা হয়েছে মনে করে বাইক থামালাম । বন্ধু রাকেশ বলল, বাইক না থামালেই ভালো হতো । কার ঝামেলা কার ঘাড়ে পড়বে ?
-- না রে, দেখি একবার । টর্চের আলোয় চারদিক খুঁজতে থাকলাম । একটা গোঙানির মতো শব্দ । 'আমাকে বাঁচান ' -- ঝোপের আড়ালে প্রায় বিবস্ত্র এক মহিলা । ওর নিম্নাঙ্গটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে । আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না আমার । রাকেশকে ডেকে বললাম, জলটা নিয়ে আয় । মেয়েটির মুখে মাথায় জল দিয়ে জানতে পারলাম ভাইয়ের সঙ্গে ফিরছিল ও । আমি অনেককে ফোন করলাম । সঙ্গে থানাকেও । খুঁজে পেলাম ওর ভাইয়ের রক্তাক্ত দেহ । আর একটু দূরে মুখ থেঁতলানো এক দুষ্কৃতী । সাংঘাতিক ভাবে আহত মালতী হাসপাতালে পুলিশকে জবানবন্দি দেওয়ার সময় বলল , আমরা তো স্বাধীন দেশের নাগরিক । তাহলে সন্ধ্যে সাতটার সময় কেন আমি বাড়ি ফিরতে পারলাম না ?
তারপর অনেক চেষ্টা করেও ওকে বাঁচানো যায়নি । শুধু ওর প্রশ্নটাই থেকে গেছে । (শেষ )
# কলমে রথীন্দ্রনাথ রায়
গ্রাম + পোস্ট গীধগ্রাম
পূর্ব বর্ধমান সূচক 713143
মোবাইল নং 9064807207 wh
No comments:
Post a Comment