স্ত্রী--
তৈমুর খান
ভোর থেকেই ডাক্তারখানায় মানুষের আনাগোনা। সকাল ৭-টা হলে একজন কর্মচারী কাগজ-কলম নিয়ে এসে হাজির হন। হাঁক দিয়ে বলেন: যারা ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, তারা একে-একে নিজের নাম ও ঠিকানা বলুন এবং ফিজের ৭০০-টাকা জমা দিন।
তখন বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কে কার আগে নাম লেখাতে পারবে তারই প্রতিযোগিতা।
আমি সবার আগে এসেও পারলাম না। আমার সিরিয়াল হল ৩০,অর্থাৎ সবার শেষে। রাত দুটোতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তা হোক, কী আর করা যাবে! চায়ের নেশা। ঘনঘন চা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দেবো।
সারাদিন মানে! সারাজীবনই তো কেটে গেল!
কয়েকটা কবিতার বই, চাকুরীবিহীন দুটি সন্তান-সন্ততি এবং রোগা-পটকা একটা স্ত্রী। সংসার কোনোদিন সচ্ছল হয়েছে? থাক সেসব কথা। পৃথিবীতে আর ক'টাদিনই বা আছি! হার্ট অ্যাটাক হতে হতে একবার ফিরে এলাম। আজ তারই চেকআপের দিন। সঙ্গের লোকগুলো একে একে সবাই চলে গেল। আমিও যাবার জন্য পথের মাঝখানে।
দূরে কী একটা পাখি ডাকছে: মেঘ হোক! মেঘ হোক!
হায়রে মেঘ! কত মেঘই না দেখলাম! কত বৃষ্টিতে ভিজলাম। কত বজ্রবিদ্যুৎ চোখ রাঙাল। বৃষ্টিভেজা নারীশরীর নিয়ে কত কবিতাই না লিখলাম। কত নক্ষত্র ফুটল। কত অদৃশ্য রূপসী উড়ে গেল মাথার ওপর। দোকানের এক কোণে বসে বসে কত কথাই মনে পড়ছে। কাগজ-কলম থাকলে এসব নিয়ে কবিতাও লেখা যেত। দুপুর গড়িয়ে গেছে। কত নম্বর সিরিয়াল চলছে গো?
পাশ থেকে একজন বলল: ২৭ নম্বর।
—তাহলে তো আমাকে এবার তৈরি হতে হবে!
লোকটি বলল: একজন বিধবা ভদ্রমহিলা এসে খুব কাকুতি-মিনতি করছে ডাক্তার দেখাবে বলে, কিন্তু ডাক্তার ৩০-এর বেশি রোগী দেখবেন না।
—কে ভদ্রমহিলা?
কথা শুনেই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখি এলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে অর্জি। হ্যাঁ ঠিকই, অর্জি বেগম!
তখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি। অর্জির দাদা আমার সহপাঠী। নানা ছুতোয় ওদের বাড়ি যেতাম শুধু অর্জিকে একঝলক দেখার জন্য। ওরকম বড় বড় চোখ, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, দুধে-আলতা রং কতই-না ভাললাগত। খুব অল্পদিনেই ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। যেমন করেই হোক অর্জিকে পেতে হবে। একটাই লক্ষ্য। একটাই সংকল্প। যেদিন পুকুরঘাটে ভেজাকাপড়ে ওকে স্নান করতে দেখতাম, কিংবা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টি পড়লে যখন ও খুব ছুটত, তখন আমার মনটা অস্থির হয়ে উঠত। ওর শরীরের লোভনীয় অংশগুলি যেন আকুল হয়ে ডাকত আমাকে। একখণ্ড শরীর কাপড়ের ফাঁকে জ্বলজ্বল করে উঠত। মনে হত ঐশ্বরিক আলোর বিভা। আমি চমৎকৃত হতাম। তাকে নিয়ে স্বপ্ন বেড়েই চলল। সেই অর্জি আজ বিধবা!
মনে মনে আমিই তো কবেই তাকে বিয়ে করে নিয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমি তখন বিএ ক্লাসের ছাত্র। গরীব ঘরের সন্তান সব প্রস্তাব এককথায় নাকচ করে দিয়ে ওর বাবা বলেছিল: বামন হয়ে চাঁদে হাত!
তারপর ভিন্ন জেলার এক গেরস্থ বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিল অর্জির। শুনেছি তিন মেয়ে তার। দুটির বিয়েও হয়ে গেছে।
ছুটে এসে হাত ধরল অর্জি। কোনো ভুমিকা না করেই বলতে লাগল: তৈমুরদা, আমি ক'দিন থেকে খুব অসুস্থ। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছি। আমাকে ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করে দাও। ঠিক সময়ে আসতে পারিনি।
বহুদিন পর তোমাকে দেখছি অর্জি! তোমার এরকম চেহারা দেখব ভাবিনি! ঠিক আছে এসো।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে ডাক এলো: সিরিয়াল ৩০, তৈমুর খান!
—এইযে আসছি!
—মেয়েটি কেন? একে তো ফিরিয়ে দিলাম!
—আজ্ঞে! নামটি আমিই লিখিয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে দেখানোর জন্য!
ডাক্তার অনেকক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে রইলেন আমাদের।
***তৈমুর খান, রামরামপুর(শান্তিপাড়া), ডাকঘর রামপুরহাট, জেলা বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। পিন কোড:731224, চলভাষ:9332991250
ইমেইল: taimurkhan1967@gmail.com
No comments:
Post a Comment