নারায়ণ রায়।
রবিবার গুলোতে অমলকে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে হয়, নাতনিকে নাচের স্কুলে নিয়ে যেতে হয়। আজ হোলির ছুটি তাই নাতনিকে নিয়ে বেরনোর ব্যস্ততা নেই। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই অমল দেখতে পান আবাসনের বাচ্ছা ছেলে মেয়েরা হোলি খেলার আনন্দে মেতে উঠেছে, নাতনি ঝিলিকও কি সুন্দর বন্ধুদের সঙ্গে রং মেখে রঙীন হয়ে উঠেছে। ঝিলিকের মত বয়সে ঝিলিকের বাবা ছোট্ট সেন্টুও হোলির দিনে মনের আনন্দে এমন রঙীন হয়ে উঠতো।
এসব কথা মনে পড়তেই অমলের চোখদুটো অদ্ভূত এক অনুভুতিতে চক চক করে উঠলো। সে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা এমনই এক হোলির দিনে সকালে সদ্য বিবাহিত অমল নিজের ঘরে রেকর্ড প্লেয়ার চালিয়ে মন দিয়ে একটার পর একটা হোলির গান শুনে যাচ্ছে, এমন সময় মিটি মিটি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলো মিনতি। সদ্য স্নান সেরে ঘরোয়া ভঙ্গিমায় একটা তাঁতের শাড়ি পরা মিনতিকে সেদিন পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দরী বলে মনে হয়েছিল অমলের। হঠাৎ অমলকে অবাক করে দিয়ে তার পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পরে অমল কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুপায়ে আবীর দিয়ে ঢিপ করে প্রণাম করে দিল।
অমল তাড়াতাড়ি মিনতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, দূর বোকা মেয়ে, তোমার স্থান বুঝি আমার পায়ে? এই বলে অমল তার ঠোঁটদুটি মিনতির ঠোটের উপর ছোঁয়ানোর আগেই মিনতি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলো, ইস্ কি আহ্লাদ! কেউ দেখে ফেলুক আর আমি লজ্জায় মরি আর কি! আচ্ছা পরে আসবো'খন, না হলে তো আবার বাবুর রাগ হবে ষোল আনা। এখন যাই মাকে লুচি বেলতে সাহায্য করতে হবে।
রান্না ঘর থেকে বৌমার লুচি ভাজার গন্ধ বেরোচ্ছে। সেন্টু তার ঘরে ল্যাপটপে কি যেন কাজ করছে। রবিবার বাড়ির সবার সঙ্গে বসে অমলেরও লুচি আর কালো জিরে দিয়ে সাদা সাদা করে আলুর চচ্চড়ি এবং শেষ পাতে দুপিস কালাকাঁদ সন্দেশ খেতে খুব ইচ্ছে করে। অমলের আলু এবং ঘিয়ে ভাজা জিনিস খাওয়া বারণ, আর মিষ্টি তো একেবারেই নিষেধ। একটু পরে বৌমা শুকনো মুড়ি আর শশা দিয়ে গেল...। এখন দাঁত টাও বেইমানি করছে শশা চিবতে আসুবিধা হয়।
আজ সকালে বাজার যাওয়া সম্ভব নয় তাই ছেলে গতকাল রাত্রে অফিস থেকে ফেরার পথে, হাজীর মাংসের দোকানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে খাসির মাংস কিনে এনেছে। অমল তার নিজের ঘর থেকেই শুনতে পেল মাংসটা বৌমার হাতে দেওয়ার সময়ে ফিস ফিস করে ছেলে বলল, এই নাও Signature আনলাম বারোশো টাকা করে দাম নিল। ফ্রিজে রেখে দাও। কাল বিকেলের পার্টিতে আমার বস্ নিজে আসবে বলেছে তাই এই হলদিরামের স্নাক্সগুলোও নিয়ে এলাম। সামনে আমার প্রমোশন ডিউ, ওনার কনফিডেনশিয়াল রিপোর্টের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
মনে পড়ে সেই সব দিনের কথা সেসব দিনও ছিল এমনই হোলির দুপুর। মিনতি খাসির মাংসটা রাঁধতো ভারী সুন্দর। রবিবার দুপুর বা এমন হোলির দিন মানেই কাগজি লেবু দিয়ে পাঁঠার ঝোল আর পুদিনার চাটনী। ছোট্ট সেন্টুটাও বাপের মত। খাসির মাংস খেতে বড্ড ভালবাসে। অমল নিজের বাটি থেকে নরম দেখে মাংস আর মেটে গুলো সস্নেহে ছেলের পাতে তুলে দেয়, সেন্টু আরও বলত, বাবা পাইপ খাবো। অমল পরিষ্কার দেখে লম্বা হাড়টা সেন্টুকে দিতেই সে সুরুৎ করে চুষে ভিতরের শাঁসটা খেয়ে নিত, এই হ'ল পাইপ খাওয়া।
অবশ্য বেশ কিছুদিন হ'ল ডাক্তারবাবু অমলকে খাসির মাংস খেতে বারন করেছেন। ছেলের অবশ্য সেসব দিকে ভীষন নজর, নিজেদের জন্য খাসির মাংসের সঙ্গে বাবার জন্যও চারা পোনা নিয়ে এসেছে। ...বৌমার আবার নজর ততোধিক...। তার শশুরের জন্য পেঁপে দিয়ে পাতলা করে চারা পোনার ঝোল করে দেবে।
তবে অমলের পৈত্রিক বাড়িতে অবশ্য হোলির দিনে গোপীনাথ জিউ এর পূজো হ'ত এবং সারাদিন নিরামিষ খাওয়া দাওয়া। মা সকালেই চান করে তাঁতের শাড়ি পরে পুজোর জোগাড়ে বসে যেত আর সঙ্গে হেল্পিং হ্যান্ড মিনতি। মা গাওয়া ঘি এর লুচি ভাজতেন আর সঙ্গে মোহনভোগ। মায়ের হাতের তৈরী এমন সুস্বাদু মোহনভোগ অমল জীবনে আর কোথাও খায়নি। খুব সুন্দর করে সুজিকে গাওয়া ঘিয়ে ভেজে কাজু কিসমিস দিয়ে অসাধারণ ঝুর ঝুরে সুস্বাদু এক মোহনভোগ তৈরী করতো মা।
সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির উঠোনে কীর্তনের আসর বসত। হারমোনিয়াম, খোল করতাল সহযোগে কীর্তন শুরু হতেই সমগ্র বড়ির পরিবেশটাই যেন পালটে যেত! অমল অবাক হয়ে লক্ষ্য করত, বিধবারা যারা জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই সংসার, প্রেম, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত, তারাই সবচেয়ে বেশি নিবিষ্ট মনে কীর্তন শোনে। বিশেষ করে গানের মাঝে যখন গলায় রজনীগন্ধার মালা পরে কপালে চন্দন চর্চিত কথকঠাকুর কৃষ্ণলীলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতেন তখন অনেকেরই চোখে জলের ধারা কোন বাধা মানতো না। অমল অবাক হয়ে শুনতো সেই ব্যাখ্যা।
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন,
তুমি যেখানে, আমিও সেখানে, আমাদিগের মধ্যে নিশ্চিত কোন ভেদ নাই। দুগ্ধে যেমন ধবলতা, অগ্নিতে যেমন দাহিকা, পৃথিবীতে যেমন গন্ধ, তেমনই আমি তোমাতে সর্বদাই আছি। কুম্ভকার বিনা মৃত্তিকায় ঘট করিতে পারে না, স্বর্ণকার স্বর্ণ বিনা কুণ্ডল গড়িতে পারে না, তেমনই আমিও তোমা ব্যতীত সৃষ্টি করিতে পারি না। তুমি সৃষ্টির আধারভূতা, আমি অচ্যুতবীজরূপী। আমি যখন তোমা ব্যতীত থাকি, তখন লোকে আমাকে ‘কৃষ্ণ’ বলে, তোমার সহিত থাকিলে শ্রীকৃষ্ণ বলে। তুমি শ্রী, তুমি সম্পত্তি, তুমি আধারস্বরূপিণী, সকলের এবং আমার সর্বশক্তিস্বরূপা।
অমল লক্ষ্য ক'রত এই ব্যাখ্যা শোনা মাত্র ওর বাল্য বিধবা পিসি যার স্বামীর মুখখানাই আজ আর মনে পড়েনা সেই পিসিও অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে।
বিকেলে অমল এক কাপ চিনি ছাড়া লিকার চা খেয়ে পাড়ার শীতলা মাতার মন্দিরে কীর্তন শুনতে যাবে। তবে ৭টা নাগাদ বৌমা গিয়ে নিয়ে আসবে... আজকাল সন্ধ্যার পর রাস্তা পার হতে ভয় হয়। বাড়িতে এসে অন্ধকার ঘরে চুপ করে শুয়ে থাকতে হয়, টি ভি দেখতে ইচ্ছে করলেও উপায় নেই...চোখ দুটো আজকাল বেশ জ্বালাতন করছে। পাশের ঘরে বৌমা ঝিলিককে গান শেখাচ্ছে। বৌমার গানের গলাটি ভারি মিষ্টি। ঝিলিকও বেশ গাইছে ভাল। তবে কেন জানিনা আজ ওরা কোন হোলির গান গাইছে না। ওরা গাইছে:-
""মধুর, তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হল শেষ-
ভুবন জুড়ে রইল লেগে আনন্দ-আবেশ।
দিনান্তের এই এক কোনাতে সন্ধ্যামেঘের শেষ সোনাতে
মন যে আমার গুঞ্জরিছে কোথায় নিরুদ্দেশ।""
আজ সাতটা বাজার একটু আগেই বৌমা গিয়ে অমলকে কীর্তনের আসর থেকে নিয়ে এসেছে।
ঝিলিক অমলের গায়ের উপর পাদদুটো তুলে দিয়ে দাদুর পাশে শুয়ে আছে। ওকে উপেন্দ্রকিশোরের 'ভালা বুড়া'র গল্পটা বলতে হবে।
ড্রইং রুমে ছেলের ক'জন বন্ধু এসেছেন, ওদের ঘরের দরজা বন্ধ। ওরা নিশ্চই বর্তমান বাজার দর আর রাজনীতি আর আগামী ভোট নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। বৌমা মাঝে মাঝে ওদের ঘরে খাবার দাবার দিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে দরজা ফাঁক হতেই কাঁচের গ্লাসের ঠুং ঠাং শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ঘরের হালকা আলোয় অমলের চোখ গিয়ে পড়লো দেয়ালে টাঙ্গানো মিনতির বাঁধানো ফটোটার দিকে। ওদের যখন বিয়ে হয়, তখন মিনতি মাত্র ষোল আর অমলের ছিল চব্বিশ। কি বোকা আর ভীতু ছিল মেয়েটা। কোনদিন ঘরে একা কিছুতেই শুতে পারতো না। অথচ মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে একা একা এক ঘোরতর অন্ধকারের রাস্তা ধরে কোথায় যেন চলে গেল মিনতি! সত্যিই সুন্দরী ছিল মিনতি। ফটোতে মানুষের বয়স বাড়ে না.....কি সুন্দর হাসিমুখে তাকিয়ে আছে অমলের দিকে। ভাবখানা এমন যেন--- "কি গো কেমন জব্দ ?" অমল জবাব দেয়, "গিন্নি, তুমি ভেবেছিলে আমাকে আচ্ছা জব্দ করবে, আমি বিপদে পড়বো? কিন্তু তুমি হেরে গেছো, এই দেখ আমি কেমন বিন্দাস আছি।" আর এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো ভিজে এলো।
No comments:
Post a Comment