সান্ত্বনা চ্যাটার্জী
আমরা আপাত দৃষ্টিতে যা দেখি সব সময় সেটা আমাদের বোধ শক্তি র সঙ্গে মেলে না। আমরা হামেশাই অনেক কিছুর ভুল ব্যাখ্যা করি। আজ আমি আমার জীবনের তেমনি একটা ঘটনা লিপি বদ্ধ করছি।
এটা প্রায় বছর পনের আগের ঘটনা। তখন আমি বছর তিরিশের যুবক, বিয়ে পাশ করে, এম বি এ করে বছর দুইএকটা মাঝারি সংস্খার সহকারী ম্যানেজার ।কলকাতার ছেলে, কলকাতাতেই চাকরী। বাড়িতে বাবা মা আর আমি।বেশ একটা ফুরফুরে মেজাজ। আমার কোনো দাইত্ব নেই।বাবা আমার ডাক্তার, কাজেই, আর্থিক চিন্তা নেই। আমাদের বসদ বাড়িটি বাবা নিজেই তৈরী করেছেন। কাজেই অফিস বাড়ি, বন্ধু বান্ধব, খাওয়া দাওয়া , করেই দারুন সময় কাটাচ্ছিলাম ।আসলে আমি একটু বেশি মাত্রায় খাদ্য রসিক আর আমার স্বর্গাদপি গরিয়সী মা রন্ধনে বড় হোটেলের শেফ দেরথেকে কোনো অংশে কম নন।
কিন্তু ইদানীং এক ভারি উৎপাত শুরু হয়েছে।শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, এমন কি, রাস্তায়, অফিসে সর্বত্র একটিকালো কাপড় পরিহিতা দেখা দিচ্ছে। মোটামুটি সপ্তাহ খানেক আগে মাঝ রাতে কে যেন এসে আমায় নাড়া দিল, আমি তো তড়াক করে উঠে বসলাম। মনে হল আবছা অন্ধকারে মা দাঁডিয়ে আছে। কি হল এতো রাতে ডাকছ কেন, বলে আমি বেড সুইচ টা জ্বালালাম। অবাক কান্ড কেউ কোথাও নেই। আমি ঘরের বাইরে এসে দেখলাম বাবামার ঘর অন্ধকার, চারিধার নিঃশ্চুপ । মনের ভুল ভেবে আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে চায়ের টেবিলে কথাটা বলতেই মা বলল নিশ্চয় পেট গরম হয়েছিল তাই...
মা দয়া করে তোমার সব কিছুর কারন পেট গরমের ব্যাখ্যাটা নিজের কাছেই রাখো তো।
আজকাল প্রায়ই দেখি মেয়েটাকে। সেদিন অফিস যাব বলে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ মনে হলঅন্ধকার ঘনিয়ে এসোছে, আসে পাশে কোনো লোক নেই, রাস্তা ঘাট শুন শান। সামান্য দূরে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটা। ভয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। বলতে চাইলাম , কে তুমি, কি চাও; কিন্তুগলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না।হঠাৎ যেনস্বপ্ন ভেঙ্গে ঘুম থেকে উঠলাম।
চারি দিকে চেয়ে দেখলাম সব কিছু আগের মতন, যান বাহন চলাচল, দোকান খোলা, বাসের জন্য অপেক্ষার আমার মতন কত লোক। যাব্বা কি হচ্ছে এসব।আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা বটে তবে ভূতের ভয়
মারাত্মক।আর সত্যি বলতে কি ভূতকে ভাল কেউ বাসেনা ভূতের প্রিয় হওয়াটা কোন কাজের কথা নয়। আমি ঠিক
করলাম এবার থেকে ব্যাগে (বিপদতারিনি )আমার মা এর ছবি নিয়ে ঘুরব। মার আমার দারুন সাহস, বাবা একটু ভিতু প্রকৃতির, মা বলে আমি আমার বাবার মতন। এক দমে এটাও বলে জীবনে কোনো ডাক্তার কে এমন ভিতু দেখিনি। আমার মেয়ে হওয়া উচিত ছিল ......আমার অবশ্য তাতে কিছুই যায় আসেনা। আমি যেমন তাতেই খুশি।
সেদিন অফিসে ,কাজে মন বসাতে পারলাম না। বাড়ি ফিরে স্নান করে , জামা প্যান্ট পাল্টে মার কাছে গেলাম।
মা তোমার মনে আছে “কালো ভয় “কে !
কালো ভয় তো অন্য কেউ নয়, সেতো তোর ছোটো কাকি। তোকে ভয় দেখাত । কিন্তু কেন , হঠাৎ তার কথা?
না এমনি।
আমার ছোটোবেলায় অনেকদিন পর্যন্ত সবাই একসঙ্গে থাকতাম। আমার তখন তিন চার বছর বয়স। ঐ বয়সে সবাই একটু দুষ্টু হয়, বায়না করে, মার কথা শোনেনা, আমি ও কোনো ব্যতিক্রম ছিলাম না। আমার ছোটোকাকুর তখন সবে বিয়ে হয়েছে, ছোটো কাকিমার বিয়ে পাশ করে বিয়ে হয়। কম বয়সে ছোটোদের বেয়াডা পনা দেখলে সাধারণত রেগে যায়। যখন মা কিছুতেই আমাকে সামলাতে পারত না
তখন কালোভয় কে ডাকত। আর আপাত মস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা কালো ভয় এসে আমাকে হাত ধরে টানত আর আমি ভয়ে মা কে জডিয়ে ধরতাম । কালো ভয় মোটা গলায় বলত
আর দুষ্টুমি করবে?
আমি সজোরে মাথা নড়াতাম।
মার কথা শুনবে?
আবার মাথা নাড়তে হ্যাঁ
তাহলে আজ ফিরে যাচ্ছি , কিন্তু এর পরের দিন কিন্তু ধরে আমার বাড়ি নিয়ে যাব। সেখানে অনেক কালো ভয়থাকে। মনে থাকবে।
হ্যাঁ, এবার ক্ষীন স্বর বেরিয়েছে ।।
কিন্তু প্রতিবার একই ঘটার পুনরাবৃত্তি , আমার দুষ্টুমি, কালো ভয়ের আসা, আবার ফিরে যাওয়া।
আমার মনে হতো কালো ভয় বোধ হয় আগের বারের কথা ভুলে গেছে।
একটু বড় হয়ে জানলাম কালোভয় আসলে ছোটো কাকি।
যাকে আমি ইদানীং সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি তার পরনে একটা কালো কাপড়, তাই দিয়ে তার সর্বাঙ্গ ঢাকা থাকে কেবল মাত্র এক জোড়া তীক্ষ্ণ সন্ধানী চোখ ছাড়া ।
এক সপ্তাহ হতে চলল সে রোজ আসে আমার কাছে, কখনো স্বপ্নে আবার কখনো বা জাগরণে ।
ভূতের ভয় আমার অনেকটাই প্রশমিত ।এতো শান্ত ভূত কে ভয় পাওয়ার কোনো কারন নেই। বেশ শান্ত শিষ্টনিরীহ ভূত। আমার তো সন্দেহ হয় ভূতটা খুবই ভীতু , ভাবছি এর পর আমি নিজেই আলাপ করব। বেচারাকোনো বিপদে পড়েছে হয়ত।আমি ঠিক
করে ফেললাম আজই তাকে অভয় দিয়ে কাছে ডেকে নেব। বলব ভয় কি , হাত বাডালেই বন্ধু পেয়ে যাবে, আমিতো হাত বাডিয়েই বসে আছি। তুমি নিশ্চিন্তে আমাকে তোমার কথা বলতে পার।
এমনিতে আমার বাডি ফিরতে ইচ্ছাই করেনা আজকাল। বাবা মা পিছনে এঁটুলির মতন সেঁটে গেছে, এবারএকটা বিয়ে কর।
কেন বল তো। আমার এই তো সবে তিরিশ পেডিয়ে একত্রিশ চলছে, এত তাডাহুডোর কিআছে।
না বাবা তুই বিয়ে কর, তোর বিয়ে হবে, আমাদের নাতি পুতি হবে......
ব্যাস, শুরু হয়ে গেলে, তোমরা কি আদ্যিকালের বুড়ো বুড়ি! এ সব বোকা বোকা কথা বোলো না তো। আমারঅসহ্য লাগছে।
তা লাগুক তবু বিয়ে তোকে করতেই হবে। তোর কোনো পাত্রি পছন্দ আছে, মানে কোনো বান্ধবী টান্ধবী!
না, জানোই তো আমি প্রেম করা টাইপের নই।
আহা, প্রেম না করিস কোনো পছন্দের মতন মেয়ে থাকলেই চলবে, বাকী টা আমরাই সামলে নেব।
দেখো আমার পিছনে পড়ে থেকো না তো। এবার তা হলে হস্টেলে গিয়ে থাকব।
কোন হস্টেল, কি নাম.....
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকি।
এর পর শুরু হয়েছে পাত্রীর ছবি দেখানো।
এই দেখ ছবিটা, কি সুন্দর না! সব দিক দিয়ে ভালো মেয়ে, রুপু (আমার মাসী) পাঠিয়েছে।
আমি যাই পিন্টুর বাডি ঘুরে আসি...
তখনকার মতন রেহাই মিলল।
টিভি চালিয়ে খবর শুনতে বসেছি, মা চা বিস্কিট দিয়ে গেছে । খবর চালানোটা বাবা মা কে দূরে রাখার উপায়! ভালই কাজ দেয়, আমার চোখ টিভির পর্দায় কিন্তু মন অন্যত্র। হঠাৎ দেখি টিভি তে ভূতটা এসে দাঁডিয়েছে, কালো কাপডের আড়াল থেকে দুটো চোখ ধক ধক করে জ্বলছে। আমি বললাম হঠাৎ টিভি তে! তোমার প্রবলেমটা কি বলতো!
কালো কাপড় সরিয়ে আমার দিকে তাকাল, একটা বীভৎস কঙ্কাল, এই বড় বড় সাদা দাঁত বের করে হাসছে।টিভির বাইরে তার কঙ্কাল হাত বাডিয়ে দিয়েছে।
যখন চোখ খুললো দেখি বাবা মা সামনে।
কি হলো রে, হঠাৎ মা বলে ডেকে অজ্ঞান হয়ে গেলি !
ওরে বাবা , আমার জন্য পাত্রী দেখ, একটা ভূতনি পিছনে লেগেছে, আজ টিভির ভিতর থেকে ডাকছে । ভয়েআমার দাঁতে দাঁত লেগে গেছে।
বাবা মার সে কি হাসি, ছাত ভেঙ্গে পরার যোগার।
বিয়ে করার ইচ্ছা হয়েছে তাই বল না, আবার ভূতনি কে টানিস কেন।
তোমাদের সঙ্গে কথা বলাই মুশকিল। বলছি যে এক ভূতনি সাত দিন থেকে পিছনে লেগেছে ঠিকক
যেন কালোভয় , আজ টিভি থেকে হাত বের করে আমায় ডাকছে, বলে কিনা , আমায় উদ্ধার কর, বড় কষ্ট!তখনি তো আমি অজ্ঞান হয়ে গেছি।।
আমি কেনো যে ওস্তাদি মেরে হাত বাডালেই বন্ধু বলতে গেছিলাম!
বাবার মোবাইল বেজে উঠল।
হ্যাঁ বল মাধব (আমার ছোটো কাকু)।
সে কি ,কবে হল এ সব! কত দিন ছিল্ হাসপাতালে? ওরা সব ভালো তো!
এতো দিন পরে জানাচ্ছিস! ঠিক আছে ঠিক আছে।
বাবা আমার দিকে অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে আছে। আমি আর মা এক সঙ্গে বললাম কি হয়েছে।
আমার ছোটো কাকা, কাকি আর যমজ ছেলে নান্টু ঝন্টু কানাডায় আছে বেশ কিছু বছর । দেশে এলে এখানেই ওঠে। দেশের বাড়ি এখন কেউ থাকেনা, এক দারোয়ান ছাড়া।
আট দশ দিন আগে গাডি নিয়ে বেরিয়েছিল হাই ওয়ে তে। কাকু গাডি চালাচ্ছিল, কাকা পাশের সিটে কাকি, আর নান্টু ঝন্টু পিছনের সিটে। একটা মারাত্মক একসিডেন্টে গাডি উল্টে যায়। সেই অবস্থায় ওখানেই পড়ে থাকে যতক্ষন না খবর পেয়ে পুলিশ আসে।সবাই গুরুতর যখম হয়েছিল। পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কাকি পরের দিন মারা যায়, কাকু আর দুই ছেলেভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে, কিন্তু মানসিক ভার সাম্য ফিরতে অনেক সময় লাগে। আজই হাসপাতাল থেকে ছাডা পেয়েছে।তরুর (ছোটো কাকি)কোনো ক্রীয়া কর্ম হয় নি তাই তোকে
দিয়ে একটা পিণ্ড দান করাতে বলেছে। তোকে যে তোর কাকি বড ভালো বাসতো।
আমার চোখের জল বাঁধ মানেনা, ছোটো কাকি মরে গিয়েও আমায় ভোলেনি।
আমি কেনো যে ওস্তাদি মেরে হাত বাডালেই বন্ধু বলতে গেছিলাম!
বাবার মোবাইল বেজে উঠল।
হ্যাঁ বল মাধব (আমার ছোটো কারু)।
সে কি ,কবে হল এ সব! কত দিন ছিল্ হাসপাতালে? ওরা সব ভালো তো!
এতো দিন পরে যানাচ্ছিস! ঠিক আছে ঠিক আছে।
বাবা আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। আমি আর মা এক সংগে বললাম কি হয়েছে।
আমার ছোটো কাকা, কাকি আর যমজ ছেলে নান্টু ঝন্টু কানাডায় আছে বেশ কিছু বছর । দেশে এলে এখানেই ওঠে। দেশের
আট
আমার চোখের জল বাঁধ মানেনা, ছোটো কাকি মরে গিয়েও আমায় ভোলেনি।
No comments:
Post a Comment