জি০ সি০ ভট্টাচার্য্য
বেশ কিছুদিন আগেকার কথা।
তখন বেনারসে উগ্রবাদীদের উৎপাত খুব বেশী বেড়ে উঠেছিল। আজ কোন শিবমন্দিরে তো কাল আবার কোন দেবীমন্দিরে বড় বড় সব বোমা আর টাইমবোমা ফাটা শুরু হয়েছিলো… এমন কি বিখ্যাত সংকটমোচন হনুমানজীর মন্দিরও বাদ পড়েনি…তখন পুলিশের ধরপাকড় আর কড়াকড়ি ও খুব বেশী বাড়লো তবে সেই ঝামেলা সহজে শেষ হয়নি। কাছারিতে ও বেশ দড়াম… দুড়ুম… হয়েছিলো।…
সে যাক… আমার এই গল্পের শুরুটি হয় এইসব ঝঞ্ঝাটের কয়েকমাস আগেই …তখন বর্ষা কাল আর সেই কালটি যে আমার খুব একটা পছন্দের নয় তা সবাই মানে চঞ্চল অবধি বেশ জানে ও। কিন্তু প্রকৃতির কাছে তো আমরা অসহায়… কাজেই বৃষ্টির জলে ভিজতে ও হয় আর অসাবধানে পা ফেললেই পা পিছলে আলুর দম… মানে ধপাস… ধাঁই…ও হ’তেই হয় তবে সেটিকে আলুর দম যে কেন বলে তা কিন্তু গভীর গবেষণার বিষয়।
একদিন সেই বর্ষাকালের মেঘমেদুর দুপুরে দু’টোর পরে ছুটি হ’তে তখন আমি কলেজ থেকে বাড়ী ফিরছি…বলা নেই কওয়া নেই ঝমঝমিয়ে হঠাৎ করে বৃষ্টি এসে গেলো আর আমি ও সাইকেল থামিয়ে ছুটে গিয়ে তখন একটা দোকানের শেডের নীচে চার পাঁচ জন লোকের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলুম।‘ …
‘সঙ্গে অবশ্য আমার একটা ছাতি ছিলো কিন্তু সে যা বৃষ্টির বেগ…সাইকেল চালিয়ে যেতে গেলে তখন ছাতি অচল। হাওয়াতে জলের ঝাপটায় ভিজে কাকটি হ’তেই হ’বে। তাই দাঁড়িয়েই আছি… বৃষ্টি ও থামে না আর আমি ও যেতে পারি না’।
‘দেখতে দেখতে সব রাস্তা জলে জলময়। তখন ও আমার দাদা বাইরে মানে লখনউতে পোষ্টেড, একটা প্রোমোশন নিয়ে সোজা দিল্লী যাবার প্রস্তুতিতে লেগে আছে আর ঘরে বৌদি একলা আমার ভাত নিয়ে বসে থাকতো। সে এক মহা ঝঞ্ঝাট…কি যে করি? খিদেয় পেট জ্বলছে এদিকে’।
টানা একঘন্টা পরে বৃষ্টির বেগ একটু কমতে বেরিয়ে পড়বো কি না তাই ভাবছি আমি। হঠাৎ দেখি যে দূরে আড় হ’য়ে পড়ে থাকা বৃষ্টির জলে আধডোবা একটা ডাস্টবিন ড্রাম একটু একটু নড়ছে। মনে হ’লো নির্ঘাৎ কোন কুকুর টুকুর হবে…বৃষ্টির ভয়ে ড্রামের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলো আর এখন বৃষ্টি কমতে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করছে।
‘তা আমার অনুমান কিছুটা ঠিক…
অনেক কসরত করে শেষে সেই ড্রাম থেকে কেউ হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো ঠিকই তবে সেটা কুকুর না বেড়াল তা আমি দূর থেকে কিছুটি বুঝতে পারলুম না। বৃষ্টি তখন ধরে এসেছে। তাই আমি সাইকেল নিয়ে হেঁটেই এগিয়ে গেলুম আর কাছে গিয়ে চমকে উঠলুম। একি? এ তো কুকুর বেড়াল নয়…একজন মানুষ। তার পরণে আছে শতছিন্ন ময়লা একটা শার্ট আর প্যান্ট আর গালভর্তি গোঁফদাড়ী..সেই পোষাকের রঙ বোঝা ও কঠিন। আমি তো বেশ অবাক’।
‘আমি জানতে চাইলুম তুমি কি করছিলে ওই ড্রামের ভিতরে? সে কোন উত্তর দিলো না। লোকটা বোবা না কি? আমি তখন হাতের ইসারায় জানতে চাইলুম আবার। এইবার সে ও পেট আর মুখ দেখিয়ে বললো যে সে কিছু খেতে চায় মানে ডাস্টবিনে সে খাবার খুঁজছিলো কুকুর বেড়াল আর কাকের মতন।
আমি ইসারায় বললুম তা তুমি এদিকে এসো। আমার সঙ্গে জলের বোতল ছিলো…ব্যাগ থেকে সেটা বের করে ইসারায় বললুম..নাও হাত মুখ ধুয়ে নাও। সে তাই করলে’।
বর্ষাকালে তখন আমার ব্যাগে সবসময় সঙ্গে এক সেট করে বাড়তি জামা প্যান্ট থাকতো যাতে হঠাৎ করে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলে ও দিনভোর আমাকে সেই ভিজে জামা প্যান্ট পরে থেকে জ্বরে না পড়তে হয়।
‘আমি লোকটাকে আমার একটা আকাশী রঙের প্যান্ট আর সরু সরু কালো চেকওয়ালা সাদা জামা ব্যাগ থেকে বের করে দিয়ে তাকে পরতে ইসারা করলুম। সে সব পরে নিলে আমি বললুম আমার সঙ্গে এসো তো।
জায়গাটা ছিলো শিবালার রত্নাকর উদ্যানের পাশে।
সেইখানে আশে পাশে কোন হোটেল নেই। তাই আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই দু’কিলোমিটার দূরে রাজা হরিশ্চন্দ্র রোডের মোড়ে এসে একটা হোটেলের সামনে তাকে বেঞ্চে বসতে বলে হোটেলওয়ালাকে বললুম..’একে একটা খানা দাও…’
সে বললো… ‘ত্রিশ টাকা লাগবে…’
আমি টাকা দিতে তখন হোটেলওয়ালা একবাটি ডাল অনেকটা ভাত দু’টো তরকারী পাঁপড় আর চারটে রুটি সঙ্গে পেঁয়াজ আচার সব দিয়ে একটা স্টিলের থালায় করে সাজিয়ে আনলো। আমি তাকে খেতে বলে দাঁড়িয়ে রইলুম। তার খাওয়া শেষ হ’তে আমি জানতে চাইলুম যে তার পেট ভরেছে কি না। সে মাথা নাড়লো। তখন আমি হোটেলওয়ালাকে বললুম-‘আরো একটা খানা লাগবে এর জন্যে তবে সেটা প্যাক করে দাও। আটটা রুটি আর শুকনো সব্জি দিও…এই নাও ধরো টাকা’।
লোকটার হাতে খাবারের প্যাকেটটা তুলে দিয়ে আমি সাইকেলে উঠে যখন বাড়িতে এলুম তখন সাড়ে চারটে ও বেজে গেছে আর বৌদি তো একলা হাঁ করে বসে থেকে রেগে আগুন তেলে বেগুন হয়ে আছে। আমি হঠাৎ করে বৃষ্টি এসে পড়বার অজুহাত দিয়ে মান বাঁচালুম কোনমতে। তবে ওই সব কথা আর কিছু বৌদিকে বললুম না।
সেই শুরু…আর তারপরে যে’দিনই পথে আমি লোকটার দেখা পেয়েছি..সেই দিনই তার জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছি আমি। শেষে তো হোটেলওয়ালা ও আমাকে বারণ করতে শুরু করেছিলো যে ওই ভিখ মাংগাকে আমি যেন রোজ খাইয়ে পয়সা নষ্ট না করি। তা সে আমি শুনলে তো কেননা আমার মা বলতো যে তৃষ্ণার্ত আর ক্ষুধার্তকে কখনো না বলতে নেই।
সেই নিয়ে বেশ হাসাহাসি ও করতে শুরু করে ছিলো লোকে তবে আমি তাদের কথাতে কান দিইনি।
এইভাবেই পুরো বর্ষাকাল ও তারপরে শরৎ আর হেমন্তকাল ও সব একে একে কাটলো আর শীত এসে গেলো। আর তখন আমার সেমেষ্টার পরীক্ষা ও এসে পড়লো। তাই আমি তখন তো পড়াশোনা নিয়ে খুব মেতে উঠলুম। পাশটা তো অন্তত করতে হবে না কি ফেল করে তখন আমার ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হওয়া বৌদির কাছে বকুনী খেয়ে মরবো শেষে…
তা ২৪শে ডিসেম্বর শেষ পরীক্ষা হ’য়ে যাবার পরে ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারী অবধি শীতের ছুটি হয়ে গেলো আর আমি ও একটু সময় পেয়ে শিবালায় গিয়ে সেই লোকটার খোঁজ খবর নিলাম, কিন্তু কোন লাভই হ’লো না। কোথাও আর তার দেখা পেলুম না আমি। কেউ বললো দেখো গিয়ে হয়তো এই দারুণ ঠান্ডাতে বেটা টেঁসে গেছে…আবার কেউ বললো যে মনে হয় কোথা ও চলে গিয়েছে…ও’সব পাপ যতো যায় ততোই মঙ্গল। ওরা তো সমাজের ভারবোঝা আর দেশের কলঙ্ক…..কুকুর বেড়ালের ও অধম..
আমি তাদের কথা কানে না তুলে সেই অসী নদী ছাড়িয়ে লংকা অবধি সব জায়গাতেই গিয়ে খোঁজখবর নিলুম কিন্তু বৃথা। কোন লাভ হ’লো না। হতাশ হয়ে বাড়ী ফিরে এলুম। আমারই ভুল..আরো আগে আমার খোঁজ নেওয়া উচিৎ ছিলো…শীতবস্ত্রের অভাবে হয়তো লোকটা ঠান্ডাতেই মারা গিয়েছে… আহা রে.. মনে খুব কষ্ট হ’লো আমার কিন্তু তখন আর কি করা?
আর তারপরেই এলো সেই বোমা বাজির সময় আর গোটা কয়েক মন্দির ভাঙতেই হিন্দুদের সব লোকজন সবই মুসলমানদের কাজ ভেবে তেড়ে উঠলো…মার মার..করে আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যাবার সব ব্যবস্থা তৈরি হ’য়ে গেল তবে পুলিশ প্রশাসনের সাথে তখন সেনার জওয়ানরা ও এসে যোগ দিয়ে ধর পাকড়ে নেমে পড়লো আর কেউ কোন বড়ো ব্যাগ বা লাগেজ নিয়ে কোথা ও যাচ্ছে দেখলেই তারা সেই ব্যাগ ট্যাগ খুলে চেকিং করা শুরু করে দিলো…
ধরা পড়লেই শ্রীঘর বাসের ভালো ব্যবস্থা ও ঠিক হ’য়ে গেলো বলে দাঙ্গাটা আর লাগলো না তবে উগ্রবাদীরা তখন সব ধরা পড়বার ভয়ে যে যেখানে পারলো তাদের সব গোলা বারুদ বোমা সব লুকিয়ে রাখতে বা ফেলে দিতে লাগলো যত্র তত্র…সে এক অরাজক অবস্থা…
এইবার সেই জানুয়ারী মাসের কনকনে ঠান্ডার দিনটির কথা বলি। আমার পরীর দেশের রাজকুমার ভাইপো চঞ্চলের বয়স তখন হয়েছিলো মোটে আট বছর…সে তখন পড়তো চার ক্লাশে আর আমি তাকে তখন রোজ সকালে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তবে সেই তিন ডিগ্রী ঠান্ডার ভয়ানক শীতের মধ্যে ও কাঁপতে কাঁপতে কলেজে যেতুম…তা সে তো সবাই যায় তবে আমি আবার একটু শীতেই যে বেশ কাতর হ’য়ে পড়ি আর বেনারসের যা অলুক্ষুণে শীত…সে আর বলবার নয়। আমার বেশ মনে আছে যে দিনটা ছিল এক শনিবার আর ৭ তারিখ…হয়তো তিথিটা ও ছিল অমাবস্যা…তবে আমি পাঁজি দেখিনি তো…তাই ঠিক মনে নেই।
রোজকার মতন সে’দিন ও আমি ঘরে রুমহিটার আর হটএয়ার কনভেক্টর মেশিনগুলো সব চালিয়ে দিয়ে সকাল আটটার মধ্যে দুধবরণ চঞ্চল ছেলেটাকে নাইয়ে খাইয়ে তাকে গরম জ্যাকেট থেকে শুরু করে হাতমোজা অবধি সব স্কুল ড্রেস পরিয়ে দিয়ে তৈরী করে ঠিক ন’টার সময় বেরিয়ে দশটার আগে তার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেতে পৌঁছে দিয়ে আমি কলেজে চলে গেলুম…
তা বিধি বাম..সে’দিন তখন হঠাৎ খুব মেঘ করে শুরু হ’য়ে গেলো ঝমঝমিয়ে তেড়ে বৃষ্টি…মানে সোনায় সোহাগা যোগ হ’লো আর কি? কবিতার সেই আমি কই কম্ম কাবার এই বৃষ্টিতেই করলো সাবাড়…অবস্থা হ’লো আমার আর তার ফলে আমার কলেজে যাওয়াই সার হয়ে দাঁড়ালো কেননা বৃষ্টিতে ভিজে সেই দারুণ শীতে স্যারেদের আসতে বড়ো বয়েই গিয়েছে আর তখন আমি ও যে বাড়িতেই চলে গিয়ে গরম গরম খিচুড়ী পাঁপড় ভাজা আর বেগুনী খাবো….বৃষ্টির ঠেলাতে তো সেটি ও হ’বার জো রইলো না..কি গেরো বলো তো?
তার ওপরে তখন আবার আরেক হাঙ্গামা শুরু হ’লো ত্রহস্পর্শের মতন…
শোনা গেলো যে কয়েকজন উগ্রবাদী এক টন বোমা বারুদ মানে আর ডি এক্স না কি যে সব বলে…তাই নিয়ে সোজা আসছে বি এইচ ইয়ুর বিখ্যাত শ্বেত পাথরে মোড়া বিড়লার বিশ্বনাথ মন্দিরটি উড়িয়ে দিতে…
ব্যস… আর যায় কোথায়?
হৈ হৈ..করে দলে দলে লোকজন হাতের কাছে যে যা পেলো সেই লাঠি সোঁটা বন্দুক পিস্তল দা কুড়ুল চাকু নেপালিদের কুকরী সব কিছু নিয়ে ছুটলো…মার মার… করে.. উঃ…সে এক মহাবিশৃঙ্খল অবস্থা…
এমন ভীড় বাড়লো যে সব রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যাম হয়ে পথ বন্ধ হ’য়ে গেলো..সব টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ওভারলোডেড হয়ে ফোনের বাদ্যি ও থেমে গেলো আর লোকের মুখের খবরে এমন সব অপপ্রচার শুরু হ’লো যে মনে হ’লো আজ বেনারসে কোন একটা সম্প্রদায়ই শুধু টিঁকে থাকবে…দাঙ্গা লাগলো বলে…
আমি তো সঙ্গে একটা বর্ষাতি ও ছাই আনি নি যে বৃষ্টির ভেতরেই বাড়ী চলে যাবো আর সে যাবার রাস্তাটি খোলা থাকলে তবে তো যাবো? সব স্কুলবাস ও অচল হয়ে রাস্তাতেই ঠায় দাঁড়িয়ে গেছে আর তাই কোন স্কুলে ছুটির ঘন্টাও বাজছে না..
তখন সব কিছুই বন্ধ হ’য়ে রইলো…টানা তিন ঘন্টা…ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায়…
শেষে জানা গেলো যে উগ্রবাদীরা ধরা পড়বার ভয়ে তাদের সব অস্ত্রশস্ত্র গোলা বারুদ কোন এক জায়গাতে লুকিয়ে ফেলেছে আর শেষে পুলিশের তাড়া খেয়ে শিবালা ঘাট থেকে লাফ দিয়ে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পালিয়ে গেছে…জওয়ানদের গুলির শব্দ ও থেমে গেছে তাই… তখন আর কি?
সবাই…একে একে আবার যে যার ঘরে ফিরতে শুরু করলো আর বললো-‘যাঃ…শেষে ব্যাটারা কি না পালিয়ে গেলো গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে? তা কি আর করা? নইলে আজ যদি একবার হাতে পেতুম না…মজা দেখিয়ে দিতুম…শুধু বাপ ঠাকুদ্দার নয়…শালাদের চৌদ্দপুরুষের নাম অবধি ভুলিয়ে দিয়ে তবে ছাড়তুম…’
যে যার ঘরে ফিরে যেতে তখন রাস্তায় আবার যান বাহন সচল হ’লো আর সব স্কুলের বাসগুলো ও চলা শুরু হতে ছুটির ঘন্টা বেজে ওঠা শুরু হ’লো…কিন্তু তখন চারটে বেজে গেছে আর ঘোর কালো মেঘ আর কুয়াশায় চারদিক অন্ধকার হয়ে উঠেছে..যেন সেই দিনের বেলাতেই রাতের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে…
টিপ টিপ করে তখন ও বৃষ্টি পড়ছে বটে তবে আমি আর দেরী না করে সাইকেলে উঠে বসলুম কেননা এখনই তো চঞ্চলের স্কুলেও ছুটি হয়ে যাবে…তবে একহাঁটু জলে ডুবে থাকা সব রাস্তাতেই তখন ও যা ভীড়…সে আর কহতব্য নয়…আমি কোনমতে যখন দুর্গাকুন্ডুতে চঞ্চলের সানবীম স্কুলে গিয়ে পৌঁছালুম তখন সাড়ে চারটে ও বেজে গেছে…হলদে রোড লাইটগুলো ও সব জ্বলে উঠেছে আর আমি ও বেশ ভিজে গেছি তবে তখন আর বৃষ্টি পড়ছে না এই যা রক্ষা নইলে আমার কচি ছেলেটাকে ও এই অবেলাতে দারুণ ঠান্ডার মধ্যে ভিজতে ও হ’তো।
আমি চঞ্চলকে প্রিন্সিপ্যাল রুম থেকে সঙ্গে করে নিয়ে বাইরে এসে দেখি যে দুর্গাকুন্ডু রোড পুরো জ্যাম…যাঃ চলে..এখন কি করি আমি? বাধ্য হ’য়ে আমি তখন শ্বেতপাথরে তৈরী তুলসী মানস মন্দিরের পাশ দিয়ে ঘুরে সেই মদন মোহন মালবীয় বা ইয়ুনিভার্সিটি বোড় ধরে সাইকেল চালিয়ে দিলুম চঞ্চলের স্কুলব্যাগটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে আর ছেলেটাকে পিছনে বসিয়ে নিয়ে।
উপায় কি?
এখন সেই..লংকা অসী ভদৈনী শিবালা হরিশ্চন্দ্র রোড সোনারপুরা পাঁড়ে হাবেলী আর সব শেষে মদনপুরার এক কিলোমিটার লম্বা পুরো মুসলমান এরিয়া সব পার হ’তে হবে আমাকে… সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের ও বেশী দীর্ঘ পথ..উঃ… একেই বলে গেরো…
আমি একলা থাকলে কারো পরোয়া করি না কি? তবে সঙ্গে রয়েছে পরী ছেলে চঞ্চল আর বাড়িতে তার মা বসে আছে সারাদিন মনে একরাশ দুশ্চিন্তা আর ভাবনা নিয়ে…
বলা বাহুল্য যে তখন ও সেলফোনের এমন প্রচলন ছিলো না..
তাই আমি যতোটা জোরে সম্ভব আমার পুরনো দিনের সেই মজবুত হিলম্যান সাইকেলটিকে চালিয়ে দিলুম…আর চঞ্চল সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে আমাকে তার দুটো নরম চকচকে দুধবরণ হাত দিয়ে আমাকে শক্তকরে জড়িয়ে ধরে নিলো আমার সেই স্পীড দেখা মাত্র সবকিছু নিজেই বুঝে নিয়ে।
আমি ভীড় বাঁচিয়ে সোঁ সোঁ করে একমনে সাইকেল চালাচ্ছি…চারদিকে তখন ঘোর অন্ধকার হয়ে গেছে…তার ওপরে এই রাস্তাটা ও মোটেই সুবিধের নয় কেননা রোড লাইট বেশ কম আর তাও কোথাও নিভেই বসে আছে বলে বেশ অন্ধকার তবে ভীড় কিন্তু কিছু কম নেই পথে…যে যেভাবে পারছে বাইক স্কুটার এমন কি কার ও চালাচ্ছে যেমন খুশী সেই ভাবে…কোন ট্র্যাফিক পুলিশ ও নেই আর তাদের নিয়ম কানুন ও নেই। খুব সাবধানে আমি সাইকেল চালাচ্ছিলুম… লংকা…অসী নদী..অসী চৌমাথা লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির…মা আনন্দময়ী আশ্রম…সব একে একে সাঁ সাঁ..করে পিছনে চলে যাচ্ছে…ঠিক বাইকের গতিতে তখন ছুটছে আমার সাইকেল…আসছে রত্নাকর উদ্যান আর শিবালা…এই জায়গাটায় এমনি দিনেই থাকে বেশ অন্ধকার আর আজ তো কোন আলোর চিহ্ন মাত্র ও নেই…
বাধ্য হ’য়ে ব্রেকে চাপ দিতে হ’লো আমাকে এইবার আর তখনি আমার সারা গায়ে যেন একটা খুব ঠান্ডা শিহরণ খেলে গেলো…মেরুদন্ড বেয়ে নীচে নেমে এলো বরফের মতন ঠান্ডা একটি অনুভূতি কেননা সজোরে ব্রেক চাপতে গিয়ে তখন দেখি যে আমার দুটো হাতের আঙুল থেকে হাত আর কনুই অবধি সব দারুণ ঠান্ডায় একেবারে অসাড় হ’য়ে গেছে…আমি ব্রেক চাপতেই পারছি না কিছুতে আর রাস্তাটা ও সামনের দিকে এমন ঢালু মতন হয়ে নেমে গেছে ক্রমেই যে স্পীড না কমে আপনিই আরো বেড়ে উঠেছে….সর্বনাশ… এখন উপায়? এই ঘোর অন্ধকার আর কুয়াশা ভেদ করে আমার হিলম্যান ১০০ সিসির বাইকের মতন ছুটছে…ভাগ্যে সামনে চার পাঁচটা বাইক আছে মাত্র তাই নইলে কোন সাইকেল থাকলে ঠিক তার সাথে সংঘর্ষ হ’য়ে যেতো আমার।
এইবারে পার হচ্ছি সেই রত্নাকর উদ্যান আর তার পাশের সেই বিরাট বড় আঁস্তাকুঁড় ও ডাস্টবিন মানে জঞ্জাল ফেলবার বড় বড় সব ড্রামের সারি…হঠাৎ আকাশে ঝিলিক দিয়ে উঠলো বিদ্যুতের লম্বা আঁকা বাঁকা নীলচে গোলাপী আলোর তীব্ররেখা আর সেই আলোতে ক্ষণিকের জন্যে তবে বেশ স্পষ্ট দেখলুম যে কেউ একজন অদূরে আমাদের সামনে দাঁড়িঁয়ে আছে তার দুটো হাত তুলে…
কে রে বাবা? আর এই দুর্যোগের মধ্যে সে কি চায়? সে কি আমাকে থামতে বলছে ইসারায়? তা হ’তে পারে কিন্তু আমি যে এখন অসহায়…বড়ো নিরুপায়…প্যাডেল করা তো অনেকক্ষণ আগেই আমি বন্ধ করে দিয়েছি…তবু ও আমার সাইকেলের স্পীড কমেনি বরং আরো বেড়ে গেছে। এইবারে আমার দু’টো পা’ ও নীচে নামিয়ে দিলুম কিন্তু কোনই লাভ হ’লো না…হয়তো লাভ হ’তো যদি সাইকেলটা ২২ ইঞ্চির হ’তো..এই ২৪ ইঞ্চির সাইকেলে আমার পা মাটি স্পর্শ করলো না…আর সে করলেই বা কি হ’তো? নীচে সে’খানে তখন তো আর মাটি মানে কোন রাস্তা নেই..আছে অন্তত দেড় ফুট জল…আর সেই জলমগ্ন পথে আমি যতো এগিয়ে যাচ্ছি ত’তোই যেন জল আরো বেড়ে উঠছে… দু’ফুট… তিনফুট… চারফুট… আরো…আরো বাড়ছে জল… কিন্তু আশ্চর্য্য এই যে এতো জলের ভেতরে ও আমার সাইকেল বেশ জোরেই ছুটছে দু’পাশে ফোয়ারার মতন করে জল ছিটিয়ে… মনে হয় জলের তোড়ে বা ভারে সামনে কোথা ও রাস্তা অনেকটা নীচে বসে গেছে বলেই এই অবস্থা…
আমি বাধ্য হয়ে হ্যান্ডেলটাকে ডান দিকে ঘুরিয়ে দিলুম একটু…নইলে যে লোকটার গায়ে ধাক্কা লেগে যাবে…
আবার চমকে উঠলো বিদ্যুতের ক্ষণপ্রভা আলো আর সেই আলোতে আমি দেখতে পেলুম যে আমার সামনে তখন কোন লোক আর নেই তবে আছে শুধু দু’টো হাত…আর সেই হাত দুটো সমানে এগিয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে…শুধু দুটো লম্বা হাত…সেই কালো হাত দুটোতে পরা আছে একটা সাদা কালো চেক ফুল স্লিভ জামা…মাত্র দু’টো হাত…
তবে সেই জামাটা দেখে আমার যেন মনে হ’লো যে আমি খুব চিনি কেননা সেটা আমারই জামা…
সেই কালো রোগা শুকনো হাত দু’টো ক্রমেই যেন লম্বা…আরো লম্বা হ’য়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো তবে…চঞ্চল আমার পেছনে বসে ছিলো বলে সেই ভয়ংকর দৃশ্যের কিছুই দেখতে পেলো না তাই রক্ষা…নইলে সে ভয় পেয়ে গেলেই আরো এক মহা মুশকিল হ’য়ে যেতো তা ঠিক কথা…
পরক্ষণেই সেই হাত দু’টো আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলটাকে দুইপাশ থেকে চেপে ধরে এক মোচড় দিয়ে এমন একটা টার্ক ফোর্স তৈরী করলো যে আমার সাইকেল সামনে আর না গিয়ে ভীম বেগে ঘুরে গেলো ডান দিকের এক সরু গলিপথে…মেন রোড ছেড়ে…
আমি অন্ধকারে কিছুতে বা কারো সাথে ধাক্কা না খাই এই ভয়ে হ্যান্ডেলটাকে শক্ত করে চেপে ধরতে গেলুম আর…উঃরে…বাবা…করে চেঁচিয়ে উঠলুম আমি…কেননা বরফের মতন ঠান্ডা জলে ভেজা হ্যান্ডেলের শেষ প্রান্ত দু’টো যেখানে সেই হাত দু’টো এসে চেপে বসেছিলো সেই জায়গা দু’টো একেবারে আগুনের মতন গরম হয়ে উঠেছে…এ আবার কি কান্ড?
তবে সেই তাপে আমার হাতের অসাড় ভাবটা বেশ কমে এলো আর আমি আঙুল আর হাতের পাঞ্জা নাড়িয়ে ব্রেকে চাপ দিয়ে সাইকেলের গতিবেগ কমিয়ে আনতে পেরে নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম যেন কিন্তু তখন ও বিনা প্যাডেলেই আমার সাইকেল চলছে ছুটে…সাঁইই..সাঁই..করে।
তবে গতি আমার নিয়ন্ত্রনে আছে এই যা রক্ষা…
হঠাৎ বাঁ পাশে দূরে কোথা ও দুড়ুম গুড়ুম ধাঁই দড়াম…করে ভীষণ এক শব্দে আমি আঁতকে উঠলুম একেবারে…কোথা ও কি তবে বাজ পড়লো না কি রে বাবা? আবার সেই প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলো…আবার ও….পরপর সেই বিস্ফোরণ হ’তেই রইলো তবে আমি ততক্ষণে শিবালা ক্রসিংয়ে এসে হাজির হয়েছি আর পেছনে অনেকটা দূরে মেন রোডের ওপরে তখন ও শোনা যাচ্ছে একের পর এক সেই ভয়ংকর শব্দ ঝন্ঝনা…
‘ও কাকু? এতো বোমা কোথায় ফাটছে বলো তো? আমার যে খুব ভয় করছে কাকু…’
‘আরে দূর বোকা ছেলে…কোথায় বোমা? কেউ হয়তো পটকা বাজি ছুঁড়ছে…তবে আমরা সেই জায়গা তো পেরিয়ে চলেই এসেছি পাশের সরু পথটা দিয়ে তাই আর কোন ভয় নেই চঞ্চল… এখন সামনে চড়াই উঠে গেছে…বড়া গম্ভীর সিংহের পথে….আর তাই…হেঁইয়ো মারো প্যাডেল …আরও জোরে…’
তখন আর আমাকে পায় কে?
দেখতে দেখতে জমে থাকা জলবিহীন পরিষ্কার তিন কিলোমিটার পথ যেন উড়ে পার হয়ে চলে এসে একেবারে বাড়ির দরজার কছে ব্রেক কষে থামলুম আমি আর চঞ্চলকে নামিয়ে দিয়ে সাইকেল স্ট্যান্ড করতেই চঞ্চল স্কুলব্যাগটা হ্যান্ডেল থেকে খুলে নিয়ে নিজের পিঠে তুলে নিলো আর আমার হাত ধরে ঘরে ঢুকলো আর চুপি চুপি নিজের পদ্মপাতার মতে বড়ো বড়ো আর টানা টানা চোখ দু’টোকে একটু ছোট করে নিয়ে বললো-‘কাকু,সাবধান…এইবারে ঘরের বিপদের পালা… হিঃ…হিঃ…হিঃ…’।
তবে পরেরদিন সকালে খবরের কাগজ পড়ে আমার চক্ষু চড়ক গাছে উঠে গেলো একেবারে সাঁৎ করে…
শিবালার সেই আবর্জনার সব ড্রামগুলোতেই না কি ভর্তি করা ছিলো শ’তিনেক টাইম বোমা আর উগ্রবাদিদের আরডিএক্স…যা ফেলে রেখে দিয়ে পালিয়েছিল তারা আর সময় মতন সেইগুলোর মধ্যে রাখা সব টাইম বোমাগুলো আগে এক এক করে বিস্ফোরিত হ’তে শুরু করে দেয় যার ফলে তখন প্ল্যাস্টিকের জলরোধী কভার দিলে মোড়া আরডিএক্সের ড্রামেতে ও শুরু হয়ে যায় একের পর এক বিস্ফোরণ…
কয়েক হাজার পথচারী সাইকেল বাইক এমন কি কার চালক ও হতাহত হয়েছে খুব সাংঘাতিকভাবে…গোটা রাস্তাটাই নীচু হয়ে বসে গিয়েছে কয়েক হাত আর সৃষ্টি হয়েছে অনেক বড়ো বড়ো সব গর্ত যার মধ্যে একবার কেউ পড়লে তার আর রক্ষা নেই…
আর সেইভাবে গর্তে পড়ে গিয়ে কয়েক শো’ সাইকেল বাইক আর কার ও একেবারে ধ্বংস হ’য়ে গেছে। ট্রান্সফর্মার সমেত সব ল্যাম্পপোষ্ট উড়ে গেছে আর ভেঙে পড়েছে অনেক বাড়ির দেওয়াল যার ফলে গোটা এলাকার পাওয়ার আর পানীয় জলের সাপ্লাই ও হয়ে গেছে বন্ধ…
আনুমানিকভাবে মৃতের সংখ্যা এখন অবধি ৫০ জন তবে তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে…
মানে যে বা যারা সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণের সময়ে সেই পথের পথিক বা যাত্রী ছিলো তারা সবাই এখন হয় হাসপাতালে পড়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা কষছে আর নয়তো পরপারের যাত্রী হয়েছে…
আমি মনে মনেই বললুম…হুঁ…এক মাত্র আমি আর চঞ্চল ছাড়া।
তবে এই অসম্ভব কাজটি যে কি করে আর কার দ্বারা সম্ভব হ’লো তা বলা আমার পক্ষে খুবই কঠিন…
৯৪৫২০০৩২৯০;
bhattaharyagc@rediffmail.comল
No comments:
Post a Comment