Wednesday, 6 April 2022

সম্পর্কের শিকড়-- অগ্নিশ্বর সরকার

সম্পর্কের শিকড়
অগ্নিশ্বর সরকার

 অনুপ পুকুরে ঢিলটা ফেলতেই সারা পুকুর জুড়ে জলের একটা অনুরণন ছড়িয়ে পড়ল। ঢিলটা যেন খানিকটা মনের ক্লান্তিগুলিকে জলের মধ্যে প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলল। এখন সে ক্লান্ত। শ্রান্ত। অবসন্ন। সেই একঘেয়ে জীবন কাটাতে কাটাতে এখন বিরক্তি জন্মে গেছে নশ্বর এই শরীরটার উপরে।

কলেজ শেষ করার পর থেকে একটানা ছুটে চলেছে টাকা উপার্জনের পিছনে। এই মাঝবয়সে এসে আর ভালো লাগছে না। প্রথমে এই কোম্পানির একজন সামান্য মার্কেটিং স্টাফ হিসাবে শুরু করার পর অনুপ রায় এখন সেই কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, বহু অধ্যাবসায়ের সাহায্য নিয়ে আজ অনুপ এখানে পৌঁছিয়েছে। আগামী সপ্তাহেই আরও একটা কোম্পানির অধিগ্রহণ করবে। কিন্তু তারপর?

দিন দিন একটা রোবটে পরিণত হয়েছে অনুপ। খালি জেতা আর জেতা। ভারতবর্ষের মন্ত্রীদের অফিসেও একটা নিয়মিত যাতায়াত আছে। খুব ভুল না করলে আগামী লোকসভা ভোটে একটা কনফার্ম টিকিট। কিন্তু তারপর?

অর্থ, ক্ষমতা কিছুরই অভাব নেই অনুপের জীবনে। ভালোবাসা? সেই বহুবার এসেছে অনুপের জীবনে। বহুদিকে, বহুরূপে। যেমন সব কিছুরই একটা শেষ থাকে, ভালবাসাও হারিয়ে গেছে সেই শেষের ঠিকানায়। সেই সব পাওয়ার দেশে আজ অনুপ বড্ডই অবসন্ন।

এই আটপুকুর গ্রামেই জন্ম অনুপের। খুব মুখচোরা ছেলে ছিল ক্লাস এইট পর্যন্ত। পড়াশোনাতেও মধ্যমানের। ক্লাস নাইনে উঠে হটাৎ পড়াশোনায় খুব মনোযোগী হয়ে ওঠে। ফলাফল হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা থেকেই ক্লাসে ফার্স্ট। সেই ধারা আজ পর্যন্ত অব্যাহত। কলেজে পড়ার সময় কালের নিয়মে বাবা-মাকে হারায় অনুপ। একছেলে। সচ্ছল গৃহস্ত বাড়ির একমাত্র ছেলে, সুতরাং কলেজে পড়ার সময় অর্থের কোনও সমস্যা হয়নি। পড়াশোনা শেষের পর মাথায় জেদ চাপে পারিবারিক অর্থের উপর ভরসা না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। গ্রামের সম্পত্তি ভাগ চাষিদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে কোম্পানির কাজে যোগদান। গ্রাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে জমা হচ্ছে এক রাস্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের সেভিংস একাউন্টে। সেই অর্থ কোনোদিনও ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখেনি অনুপ।

ঠিক সময়ে বিয়ে হয়েছে। পরিবারে আছে এক ছেলে আর এক মেয়ে। সুখী পরিবার। অনুপের স্ত্রী পরমা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপিকা।  

 ছেলে-মেয়েও পড়াশুনায় মনোযোগী। বাবার মতোই ওরাও ক্লাসে দ্বিতীয় হতে শেখেনি। বছরে একবার সময় করে সকলে এই গ্রামের বাড়ি আসে। দু-তিন দিন থেকে ফিরে যায় কলকাতায়। গোটা পরিবার লেগে যায় ইঁদুর দৌড়ে।

গত দুদিন আগে সপরিবারে গ্রামে এসেছে অনুপ। আগামীকাল ফিরে যেতে হবে কলকাতায়। কিন্তু এবারে আর ফিরতে মন চাইছে না অনুপের। মনে হচ্ছে কী হবে ফিরে? আর প্রথম হতে ইচ্ছে করছে না।

পাশে থাকা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো। ঘাসের উপর থেকে ফোনটা উলে নিল অনুপ। সপ্তর্ষি। পরশু যে কোম্পানিটা টেক ওভার করা হবে তারই আইনি কোনও দরকারে নিশ্চয় ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে দিয়ে গম্ভীর গলায় অনুপ বলল ,

-         হ্যাঁ সপ্তর্ষি বলো।

-         স্যার আমার ডিড তৈরি কমপ্লিট। ড্রাফটা আমি আপনার হোয়াটয়সাপে পাঠিয়ে দিচ্ছি, একটু দেখে নেবেন। ডিল ফাইন্যাল হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা এটা মিডিয়াতে ঘোষণা করবো। এই খবরটা মিডিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর আপনার সাথে কথা মতো ফাইন্যান্স মিনিস্টারের কাছে একটা ফরম্যাল চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনি সময় করে ওনার সাথে একবার..

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হাতের মোবাইলটা ছুঁড়ে পুকুরের মধ্যে ফেলে দিল। গা টা এলিয়ে দিল পুকুর পাড়ের সবুজ মোটা ঘাসের উপর। কোম্পানির ওপেনিঙের দিনে মন্ত্রীমশাই এলে কর্পোরেট আর রাজনৈতিক মহলে অনেকটা উপকার হবে, কিন্তু তাতে কী মনে শান্তি আসবে? মনের ক্লান্তি ভুলে স্লিপিং পিল ছাড়া একটা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমতে পারবে? নাকি জীবন থেকে সম্পর্কের একটা একটা করে শিকড় শুকিয়ে যাবে?

No comments:

Post a Comment

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল-- রূপো বর্মন

পরিবার আর স্কুল শিক্ষার ফল  রূপো বর্মন  একদিন সকাল দশটা নাগাদ। বছর এগারোর একটি মেয়ে ও একটি ছেলে বেশ আনন্দে হাটতে হাটতে স্কুলে যা...