অদিতি ঘটক
উঁহু। কিছুতেই একটা ভালো ছবি উঠছে না। গ্যালারিতে একটাও ভালো ছবি নেই। অন্যদের ছবিগুলো কি সুন্দর ! পুরো মডেল। কি সুন্দর তার ব্যাকগ্রাউন্ড। কি সুন্দর কালার। কি সব পোজ ! ঝকঝকে তকতকে একেবারে। যেন কেয়ারি করা গাছে শিশির ভেজা তাজা গোলাপের মত টাটকা। দেখেও চোখ জুড়িয়ে যায়।
এহঃ! ছিঃ ছিঃএই গুলো কি দেওয়া যায়! কোনটা নাক বাকাঁ, কোনটি মুখ ভোঁতা, কোনটা চোখ বোজা, কোনটা ভূতের মতো তো কোনটা আবার ঠিক শ্যাওড়া গাছের শাঁকচুন্নির মতো অথচ অন্যদের ফটোগুলো দেখো মনে হবে এক একটা রণবীর কাপুর, দীপিকা পাডুকোন।।নিদেন পক্ষে জিৎ, শুভশ্রী তো লাগেই। সেখানেই নিজের ছবি দেখলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়। কোনটায় চোখ কোটরে ঢোকা। কোনটা যেন পেটরোগা রোগীর কোনটা বা উস্কো, খুস্কো পাগলির একটা ভালো ছবি কি থাকতে নেই ! সবাই এখন লেখার সাথে ছবি চায়। একটা ভালো ছবিও গ্যালারি ঘেঁটে যদি পাওয়া যায়। কখন লেখা হয়ে গেছে শুধু ছবি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সেই থেকে আটকে আছে। পাঠানো যাচ্ছে না।
---"কি গো, চা ফা কি কিছুই পাওয়া যাবে না ? সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত ঘন হয়ে গেল। বল তো রাশুর দোকান থেকে খেয়ে আসি।"
"তাই এসো। একটা কিছু মন দিয়ে করতে গেলেই ওনার গায়ে জ্বালা ধরে। ঢের ঢের দেখেছি। এ রকম চোখ জ্বালা একটাও দেখিনি। যেই দেখেছে একটু বসেছি, ওমনি হুকুম। এই করো ! ওই করো ! আর রাশুর দোকানের ভয় দেখাতে হবে না। বসো করে দিচ্ছি।"
চা খেতে খেতে মঞ্জরী আব্দারী গলায় বলে ওঠে, "এই শোনো না, আমি একটু সেজেগুজে আসছি, আমার কটা বেশ পোজ দেওয়া ছবি তুলে দাওনা। সবাই তাদের বউরা যখন সেজেগুজে কোথাও যায়। কি সুন্দর ছবি তোলে। তোমার বোনের বরকেই দেখো। ফেসবুক খুলেলেই হাজার রকম কায়দায় বর্নার ছবি। নীচে কত সুন্দর সুন্দর ক্যাপশন। 'আজ এই অনুষ্ঠান। কাল তমুক। পরশু এমনিই ঘোরাফেরা তো পরের বাড়িতেই।"
দেখে মনে হয় যেন কোনো নামি নায়িকা। যদিনা তোমার বোনের রূপ জানতাম ! তুমি ! আমি সেজেগুজে বিয়েবাড়ি গেলেও তাকিয়ে দেখোনা কি পরেছি !
প্রলয় মনের ব্যাজার ভাবটা গোপন করে বলেন, ঠিক আছে। তোমার মোবাইলটা দাও। দেখেন মোবাইলের ফটো গ্যালারি প্রায় ভর্তি। প্রায় পঞ্চাশ খানা ফটো নানান অঙ্গ ভঙ্গিমায় আজ দুপুরে তোলা। প্রলয় গলা উঁচিয়ে বলেন, কি গো ! তোমার এত সুন্দর সুন্দর ফটো থাকতে তুমি আবার ফটো তুলছ ! দেখে যাও, এই ফটো গুলো ! কি ভালো লাগছে তোমাকে ! যে তুলেছে তার ফটোজেনিক সেন্স এর তারিফ করতে হয় ! না না, আমার হাত এতো ভালই নয়।"
মঞ্জরী দৌড়ে আসে। প্রলয় এক এক করে সব দেখাতে থাকেন। মঞ্জরী মুখ বেঁকায়। "এইগুলো তোমার ভালো লাগছে ! তোমার না কোনো ফটো সেন্স নেই।"
প্রলয় মঞ্জরীর থুতনি নেড়ে দিয়ে বলেন, আমার তো সব সময় সব সাজেই তোমাকে ভালো লাগে। অনেক রাত হয়ে গেল। রান্নাটা ঝটপট বসিয়ে দাও। ছেলে, মেয়ের ফিরে আসবার সময় হয়ে গেলো তো ! আমি হারুদাদের ঠেক থেকে এক চক্কর দিয়ে এখুনি আসছি। ওখান থেকে যে কোনো একটা ফটো দিয়ে দাও। সব গুলোই ভালো।
ছেলে,মেয়ে বাড়িতে ঢুকেই মঞ্জরী কে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল। ছেলে জিগ্গেস করল," মা, তোমার কি কোথাও নেমন্তন্ন ছিল !
মেয়ে মুচকি হেসে ফুট কাটল, "না রে দাদা। মায়ের বোধহয় কোথাও স্পেশাল প্রোগ্রাম ছিল।
দুজনেই সমস্বরে বলে উঠল, "রংচং তুলে তাড়াতাড়ি খেতে দাও।"
মঞ্জরীও নাছোড় বান্দা। ছেলে মেয়ে দুজনকেই বলেন, "আগে আমার একদম পিসির মত মডেল মডেল পোজের ছবি তুলে দে। তারপর আজ পাতে খাবার পড়বে।"
"হ্যাঁ , হ্যাঁ বৌদি তো থাকবে। তুমি আসবে সে তো আমাদের সৌভাগ্য। এ বাড়ির জামাই বলে কথা। তোমার যখন খুশি তখন এসো। আমাদের আবার কি অসুবিধে ! শ্বশুরবাড়ির আসছো এতো ফর্মালিটি কেন ভাই। বৌদির কোনো প্রোগ্রাম ? নাহ, নাহ, ওত ভেবে না তো এসো। ফোনে কথা বলতে বলতে প্রলয় বাবু বাড়ি ঢুকলেন। মঞ্জরী বুঝলেন অলোকেশ আসছে।
দারুন দারুন ফটোতে গ্যালারি ভরে গেছে। লেখার সাথে এক একটা প্রোফাইল পিক তাকিয়ে দেখার মত। 'ছবিটা জাস্ট অসম, সুপার্ব, ঘ্যামা, অপূর্ব, ফাটাফাটি, ফ্যান্টাস্টিক।'
লাইক, কমেন্টের বন্যা বয়ে যায়। মঞ্জরীর বুক গর্বে ফুলে ওঠে।
শিঞ্জিনি ফোন করে একদিন বলে, দিদি তোর ছবিগুলো জাস্ট আওসম। নিশ্চয় অলোকেশ দা তুলে দিয়েছে। ওর হাতটাই আলাদা বল। দিদি একটা কথা বলব ? কিছু মনে করিস না। আগে তোর লেখা নিয়ে কমেন্ট হত। এখন তোর ফটো নিয়ে হয়। লেখাটা হারিয়ে ফেলিস না দিদি। ফটো যত সুন্দর হয়। লেখা কিন্তু তত ভালো হচ্ছে না।
মঞ্জরী ধরা গলায় বলে, "ঠিক বলেছিস। তোর জামাইবাবুও বলছিল, "আমার কলিগরা আগে তোমার লেখায় কমেন্ট করত। এখন ফটোতে করে ! "
#######
No comments:
Post a Comment